প্রধানমন্ত্রীজীর বক্তৃতা ছিল উপদেশে টইটম্বুর

  • 02 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 147 view(s)
  • লেখক: যশোমনি

বলা বাহুল্য প্রধানমন্ত্রীজীর বক্তৃতা ছিল উপদেশে টইটম্বুর। লকডাউনের তৃতীয় পর্যায়ে ঘোষণার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী যখন জনসমক্ষে এলেন, তিনি জানালেন পিপিই কিট এবং এন. নাইন্টি ফাইভ মুখাবরণী ভারতে তৈরি হত না। তিনিই এগুলির নির্মিতির কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। সম্পূর্ণ মিথ্যা ৩১শে জানুয়ারীর আগে এবং ৮ই ফেব্রুয়ারীর পর ভারতবর্ষ এই দ্রব্যগুলি রপ্তানি করছিল। করেছে ২৪শে মার্চ অব্দি। রীতিমতো সরকারি আদেশনামা জারি করে রপ্তানি বন্ধ করা হয়। প্রথম উপদেশঃ-আত্মনির্ভরতা।।

আপনি তো সরকারি শিল্পগুলিতে দিব্যি বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের সুবিধা দিয়ে ছিলেন। চাষিদের জমি নিয়ে নেবার জন্য নানাবিধ অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করা হল। একি তবে আত্মনির্ভরতা?

আসলে আমাদের দেশের কৃষক, খেটে খাওয়া মজদুর এরা নিশ্চয় আত্মনির্ভর। এঁদের সংখ্যাই তো ১১০ থেকে ১২০ কোটি। হ্যা, জেনে রাখুন, এরা সবাই স্বনির্ভর, আপনার ২০ লাখ কোটির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই জুড়ে গেল দুনিয়ার তাবৎ পুঁজি, কর্পোরেট সংস্থা আর নির্মান কম্পানিগুলি। যে ‘যোগানের’ শৃঙ্খলের কথা আপনি বলছিলেন তা আসলে রপ্তানি মূলক, ও আচ্ছা বলুন তো, এর মধ্যে ভারতের গরিব গুর্বোর অংশ কতটা?

আর এই অসুখটি ডিসেম্বর মাস থেকে ... আপনি তো কই সীরিয়াসলি এটা নিয়ে আলোচনা করেন নি। করলেন মার্চে এসে। সংসদও বসল। সংসদে আলোচনা হল না। রাজ্য সরকার, নাগরিক মঞ্চ কোথাও না। এমনকি ১৯শে মার্চ এর ঘোষণাতেও লক ডাউনের প্রসঙ্গ কেউ ভালো ভাবে বুঝতেও পারে নি। দেশ প্রস্তুত হল। না। দেশ থালা, ঘন্টা বাজাতে প্ররোচিত হল। যে মানুষগুলো ২০শে মার্চ এর পরে আর তাঁদের প্রাপ্য টাকা পেলেন না, তাঁরাও আপনার কথার জাদুতে বশীভূত হয়ে গেলেন। আর আজ অবস্থা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকার দরুন, মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। গর্ভিণী নারীর পথেই প্রসব হয়ে যাচ্ছে। দরিদ্রদের কিছু সুবিধা দেবার কথা ভাবার আগেই বিদেশাগত মানুষদের ভবিষ্যৎএর প্রিন্ট তৈরি হয়ে গেল। মানুষ বাড়ি আসতে পারল না, ট্রেন যেখানে যেখানে থেমে রইলো, কেবল যাত্রাটা প্রলম্বিত হল, বিলম্বিত হল। আপনার প্যাকেজের স্বনির্ভরতা ঠিক কী, আপনি কিন্তু খোলসা করি বললেন না। মুখ্যমন্ত্রীদের জড়ো করে আপনি সংযোগ ব্যবস্থার কথা বললেন। কৃচ্ছতা আর ত্যাগের কথা বললেন। এই আস্ত মিথ্যেটা বলতে আপনার বাধল না যে গরিবদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে গেছে। এই প্রকল্পের মধ্যে থেকেও পুরো সুবিধা কেউ কেউ পেলেন না। কেউ কেউ প্রকল্পের বাইরেই ছিলেন। রেশন উপভোক্তারাও ১০০ শতাংশ পরিষেবা পেলোনা। গরিবরা এখনও ৬ ঘন্টা লাইনে অপেক্ষমাণ।

সাইকেলে আসতে গিয়ে বাবা-মা পথে প্রাণ হারালেন। আপনি কর্পোরেটদের পিছনে ছুটছেন। আপনার ছদ্ম দেশপ্রেমের বুলি নিয়ে আপনার পোষা মিডিয়া খবর ম্যানুফাকচার করে গেল বেশ কিছুদিন।

২০ লাখ কোটি টাকার মধ্যে, আপনি বললেন অর্থ মন্ত্রী ঘোষিত ১ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি এই ঝুলির অন্তর্গত, কর্পোরেট পুঁজিকে দেওয়া ছাড় এই ঝুলির অন্তর্গত। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ৫ লক্ষ কোটি এর ভেতরে। এই সব মিলিয়ে ১৬ লক্ষ কোটি টাকা। অতএব ৪ লক্ষ কোটি টাকার গল্প এটা। জি ডি পির ২ থেকে ২.৫ শতাংশ। যদিও আপনার ঢক্কানিনাদ বলেছিল আমেরিকা ১৩ শতাংশ, ইংল্যান্ড ১০ শতাংশ দিতে পারলে ভারতই বা ১০ শতাংশ দিতে পারবে না কেন? আর তাবড় তাত্ত্বিকরা তো বলেই ফেললেন বর্তমান অবস্থায় ভারতে ৪০ কোটি মানুষের জন্য দারিদ্র সীমা চিহ্নিত করা গেল। বেকারত্ব বেড়ে দাঁড়াল ২৭ শতাংশে। এই প্যাকেজে তো কই দিন আনি-দিন খাই মজদুরদের কথা ছিল।

আপনি APMC কথা বলে FCI করতে চাইলেন।

আপনার চিন্তা বাজার নিয়ে। কৃষকদের নিয়ে নয়। যে শ্রমিকরা এই ব্যবস্থায় ধুয়ে সাফ হয়ে যাচ্ছেন, আপনার সংস্কার কর্মসূচী তাদের ধর্তব্যের মধ্যেই নেয় না। মুখামন্ত্রী থাকা সময়ে যে মডেলটা আপনার রাজ্যে চালিয়েছিলেন, সেই অনুত্তীর্ণ মডেলটাকে এখন গোটা দেশে জারি করতে চাইছেন।

আপনার এই মডেলেই তো জনজাতি আর চাষিদের জমি নিয়ে কর্পোরেটদের ব্যবসায়ে লগ্ন করে দেবার কথা আছে।

এ মডেলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার খরচ কেবল ৩০০০ কোটি। ক্ষমতায় আসার পর তিন তিন বার অর্ডিন্যান্স আনলেন। ২০১৩ সালেও জমি অধিগ্রহণ আইন পরিবর্তনে বিজেপির সম্মতি ছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে যাবতীয় বিধি ভেঙে ফেলতে চাইলেন আপনারা।

আপনারা লিকুইডিটির কথা বললেন। আপনার রাজত্বেই ৩৬টি রয়্যালটি পালিয়ে গেল দেশ ছেড়ে।

আপনার আমলেই তো ব্যাঙ্কের অনাদায়ী ঋণ দাঁড়াল ১৩ লক্ষ কোটি টাকা। demonetisation এর সময়ে সরকারি টাকা সব উঠিয়ে নেওয়া হল।

তৃতীয়বার আপনি আইনের পথ ধরলেন। আইন আপনাকে আর আপনার পোষিত লোককে বাচাচ্ছে। আর আপনার সমালোচকদের জন্য আইনের শাসন।

Medical Emergency কেও আপনি আইনের শাসনের মধ্যে আনতে চাইলেন। মুখ্যমন্ত্রী থাকবার সময়ে আপনি গুজরাটে শ্রম আইন ভেঙেছিলেন। বসুন্ধরা রাজের জমানাতেও ৪টি আইন ভাঙার চেষ্টা হয়েছিল।

আর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর করে খুল্লমখুল্লা ১০টি রাজ্যে আপনার উপদেশিকা ঘোষিত হয়ে গেল।

উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যবহার করে আপনি এক দেশ, এক ভাষা, এক মন্ত্রী, এক করের শ্লোগান বানালেন। কোন ট্রাইব্যুউনালেই এই একমাত্রিকতা ধোপে টিকবে না।

Tribulance were spoke against codification.

তবু এই এক জাতি, এক এক আইনের ধামাকাটা রয়ে গেল। এখন কেন্দ্রীয় আইনের মধ্যে গিয়ে একটি রাজ্য অর্ডিন্যান্স হাঁকাচ্ছে। এই কি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো?

আপনার বক্তৃতা ছিল স্ববিরোধিতাময়। কারণ স্ববিরোধিতা করা আপনার পেশা।

১৩৪ বছর ধরে শ্রমিকরা নিরন্তর লড়াই করে যে অধিকার অর্জন করলেন, অর্ডিন্যান্স জারি করে তাকে নিয়ে কন্দুক ক্রীড়ায় রত হয়েছে গুজরাট মধ্যপ্রদেশ উত্তরপ্রদেশ সরকার-আপনারই প্রশ্রয়ে। সংস্কারের নামে শ্রমিকরা পাচ্ছেন শারীরিক নির্যাতন। শ্রমিকরা দা স-এ পরিণত হচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-যার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আপনি-যেখানকার প্রতিটি ক্ষেত্রকে আপনি ধ্বংস করছেন ফলে speech mirror of tomorrow.

বিশ লাখ কোটি টাকার খয়রাতির জন্য আপনার মডিয়া ও তার চাকররা পুষ্প বৃষ্টি করে চলেছেন। কৃষকদের বাজারের হাতে তুলে দেওয়া হবে; সরকার দায়মুক্ত হবেন।

গুজরাট মডেল তো ডাহা ফেল ছিল, সেই ফেল্লুশ মডেল চারিয়ে যাবে ভারতে? আপনার নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে ফের শ্লোগান তুলছেন? কম্পানি চালাতে বলে রাজ্যগুলিকে বললেন আট ঘন্টার বদলে বারো ঘন্টা করতে৷ রাজ্যগুলিকেই অর্ডিন্যান্স জারি করতে বললেন। চমৎকার যুক্তরাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা; চমৎকার নৈরাজ্যের পাঠ। হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা।

একদিকে ক্রমবর্ধমান সংস্কারের বুলি, অন্যদিকে স্ফীতকায় বেকারত্ব। জি.এস.টি. এবং demonitisation এর আগেই দেশের মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছেন আপনি।

এমনকি শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী লক ডাউন পর্বে শ্রমিকদের ৩-৪ মাস মজুরি দেওয়া, সেই কথাও রাখলেন না আপনি। আন্দোলন চলবে।

0 Comments
Leave a reply