“কারাগার যা ছিল সে তো আমি ভেঙে ফেলেছি, এখন সেই উপকরণ দিয়ে সেইখানেই তোমাকে মন্দির গেঁথে তুলতে হবে”: প্রসঙ্গ বিশ্বভারতী

  • 11 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 155 view(s)
  • লেখক: প্রতীপ কুমার দত্ত

সেদিন আপনারা নানারঙের পোশাক পরে, নানান তাগিদ নিয়ে বোলপুর-শান্তিনিকেতন তথা সমগ্র বাংলা ও বাঙালীর মননের মুক্তধারার বাঁধন খানিকটা শিথিল করতে গিয়েছিলেন। হয়তো খানিকটা বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলেন আপনারা। কিন্তু কী-ই বা করতেন? ক্রমশ দমবন্ধ হয়ে আসা পরিস্থিতি যে বুকে পাথর হয়ে চেপে বসেছিল একটু একটু করে! বাইরের মানুষের পক্ষে এই কষ্ট বোঝা একটু কঠিনই বটে।

বোলপুরবাসীর আজ বড় মন খারাপের দিন!

সেদিন আপনারা নানারঙের পোশাক পরে, নানান তাগিদ নিয়ে বোলপুর-শান্তিনিকেতন তথা সমগ্র বাংলা ও বাঙালীর মননের মুক্তধারার বাঁধন খানিকটা শিথিল করতে গিয়েছিলেন। হয়তো খানিকটা বাড়াবাড়িই করে ফেলেছিলেন আপনারা। কিন্তু কী-ই বা করতেন? ক্রমশ দমবন্ধ হয়ে আসা পরিস্থিতি যে বুকে পাথর হয়ে চেপে বসেছিল একটু একটু করে! বাইরের মানুষের পক্ষে এই কষ্ট বোঝা একটু কঠিনই বটে।

কিন্তু কী বিপদ! এত রঙের মধ্যে নিন্দুকেরা কেবল একটি-দুটি রঙেরই সন্ধান পেলেন আপনাদের পরিধানে! বঙ্গদেশের অতিমাত্রায় রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত সুশীল-সমাজ বোলপুরকে কেবলমাত্র নীল-সাদা কিংবা গাড় লালে রাঙিয়ে দিয়ে শূলে চড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।  

এই বিপদের দিনে বোলপুরবাসীর ভরসা এখন একটাই – ওনাদের শূলে চড়াবার আগে, গুরুদেবকে শূলে চড়াতে হবে! হবে না-ই বা কেন? গুরুদেবই তো “উস্কানির” মূলে! না হলে কেউ বলে, “অচলায়তনে আর সেই শাস্তি দেখতে পাবে না। তার দ্বার ফুটো করে দিয়ে আমি তার মধ্যেই ঝ’ড়ো হাওয়া এনে দিয়েছি। নিজের নাসাগ্রভাগের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে থাকবার দিন এখন চিরকালের মতো ঘুচিয়ে দিয়েছি” (অচলায়তন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী প্রকাশণা, পুনমূদ্রণ পৌষ ১৩৫৬, পৃষ্ঠা ৯৮)।

হয়তো গুরুদেবের সেই কবেকার আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে, আর বোলপুর-শান্তিনিকেতন তথা সমস্ত বাঙালীর প্রাণের উৎসব পৌষমেলা ও বসন্তোৎসব বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কায় অস্থির হয়ে বোলপুরবাসী কিছুটা লাগামহীন হয়ে পড়েছিলেন। মনে রাখতে হবে, ঐদিনের ঐ অসংখ্য মানুষের অনেকেই বংশ-পরম্পরায় বিশ্বভারতীর উত্থান-পতনকে দেখেছেন – সেই উত্থান-পতনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত থেকেছেন – বিশ্বভারতীকে শ্রম দিয়েছেন।

 শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা-বসন্তোৎসবের প্রাঙ্গণকে বেঁধে ফেলা কোনো ছোট্ট বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত দেড় দশক ধরেই শান্তিনিকেতনের “খোলা মাঠের খেলা” – কে বেঁধে ফেলা হচ্ছে একটু একটু করে। পাথরের মতো বুকের উপর চেপে বসছে অত্যন্ত বিশ্রী কুরুচিকর কংক্রিটের পাঁচিল। ভিজে হাওয়ার মধ্যে খোলা মাঠে একলা বসে এলোমেলো চিন্তা করার রোমান্টিসিজমের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অবরুদ্ধ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন, আর পাঁচটা মুক্ত-চিন্তার প্রতিষ্ঠানের মতোই। শান্তিনিকেতনের মুক্ত-চিন্তার অন্যতম উপকরণ, তার বিশেষত্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ও তার “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে…” -র অন্যতম প্রকাশ তার প্রকৃতি, তার বসন্তোৎসব-পৌষমেলা। শান্তিনিকেতনের এই সবুজের সমারোহ তো কবি ও তার অনুরাগীদেরই সৃষ্টি। তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো আষ্টে-পৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার কাজ চলছিল দেড় দশক ধরে। কফিন তৈরির সেই প্রক্রিয়ারই শেষ পেরেকটা ছিল ‘মেলার মাঠ’ কে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা। কারাগারের দরজার মতো বিরাট গেট তৈরি হয়ে গিয়েছিল কয়েক বছর আগেই – বাকি ছিল ‘মেলার মাঠ’ কে ঐ গেটের সঙ্গে মিলিয়ে ‘নীরন্ধ্র বেষ্টনে” বেঁধে ফেলা। কিন্তু গোল বাঁধলো সেখানেই। ঐ ভয় ধরানো বেখাপ্পা ‘বিশ্বভারতী’ থেকে বিযুক্ত গেটখানিকেই ভেঙে ফেলা হলো!

কবিই যে প্রশ্ন তুললেন, “এমন নীরন্ধ্র বেষ্টন! এমন আশ্চর্য পাকা গাঁথনি! বাহাদুরি আছে বটে, কিন্তু শ্রেয় আছে কি?” (অচলায়তন; গ্রন্থপরিচয়: রবীন্দ্রনাথের ললিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা চিঠি; বিশ্বভারতী প্রকাশণা, পৃষ্ঠা: ১১২)।

অনেকেই বলছেন, পৌষমেলা-বসন্তোৎসব আর বাঙালীর প্রাণের উৎসব নয়, বাঙালীর অন্যতম ‘আইডেন্টিটি’ নয়; বরং তা তছরুপের জায়গা। এই (কু)যুক্তি মেনে নিয়ে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে এই উৎসব মূলত মুনাফা তৈরির অছিলা, তবুও এই দুই উৎসবের অন্য একটা গুরুত্ব থেকে যায়। কিছু বড় ব্যবসায়ীর পাশাপাশি, রাজ্য, এমনকি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত্রের অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র উৎপাদক ও বিক্রেতা প্রায় সারা বছর অপেক্ষা করে থাকেন ঐ দিন কটার জন্য। ঐ কয়েকদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম বছরের একটা বড় অংশের বেঁচে থাকার প্রয়োজন মেটায়। তাই শান্তিনিকেতনকে  বেঁধে ফেলার অর্থ রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী-কেন্দ্রিক গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনার অবক্ষয়। চল্লিশোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথ কলকাতার আরাম ছেড়ে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন শুধুমাত্র জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন নিয়েই নয়, বিকল্প গ্রামোন্নয়নের পরীক্ষাগার গড়ে তোলার জন্য। অন্য যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে বিশ্বভারতী তাই সম্পূর্ন আলাদা। তার একটা মস্ত বড় কাজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও তার চারপাশের মানুষজনের মধ্যে নিবিঢ় যোগাযোগ তৈরি করে, সার্বিক সামাজিক উন্নয়ন। অথচ এই কিছুদিন আগেই, এই মহামারী আর লকডাউনের মধ্যেই, শান্তিনিকেতনের সম্পত্তি রক্ষার অজুহাতে, রীতিমত বুলডোজার দিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে উৎখাত করা হয়েছে বহু ক্ষুদ্র উৎপাদক ও বিক্রেতাকে।

তাই শুধু হৃদয়ের টানেই নয়, বেঁচে থাকার দায়েও, সেদিন বোলপুরবাসী বিশ্বভারতীর ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তির’ আস্ফালনের উপর আঘাত করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বভারতী তো ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারনা নিয়ে তৈরি হয়নি। নেওয়ার বদলে দেওয়াকেই, প্রতিষ্ঠার বদলে প্রসারকেই, সে তার মূল কাজ ভেবেছিল। বিশ্বের জ্ঞানকে ধারণ ও তার বৈশ্বিক  ও আঞ্চলিক বিতরণ এবং এর মধ্য দিয়ে মননের ও জাগতিক জীবনের লালনপালন – এই ছিল তার উদ্দেশ্য। অথচ, আজ সম্পত্তি রক্ষার অজুহাতে সে শুধু মননের ধারাকেই বাঁধতে উদ্যত নয়, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও একটু কঠিন করে তুলতে সচেষ্ট। এ যে গুরুদেবের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান!

বোলপুরের জনগণ আসলে জনগণের সম্পত্তিতেই আঘাত করেছেন। কারণ সেই সম্পত্তি সামাজিক মঙ্গলের পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল – বিশ্বভারতী হয়ে উঠছিল ‘যক্ষপুরী’।

রবীন্দ্র আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বরং আমরা অন্য এক সৃষ্টির কথা ভাবি – ঐ ধ্বংসের উপর দাঁড়িয়েই। বোলপুরবাসী আসুন, আসুন শান্তিনিকেতনবাসী, আসুন উপাচার্য্য ও আচার্য্য। বিচারক-ধর্মাবতার, দয়া করে এই ফরমান জারি করুন: দূর হোক যান্ত্রিক বেষ্টন – প্রতিটি ইঁটকে আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে রোপন করা হোক এক একটি সবুজ চারা। ইঁট-কাঠ-পাথরের বেষ্টনীর বদলে ফিরে আসুক প্রকৃতির নিজস্ব রক্ষণ! বিশ্বকবির সাধের বোলপুর-শান্তিনিকেতনে ফিরে আসুক বসন্ত।  

(মতামত ব্যক্তিগত)

 

0 Comments
Leave a reply