মনোরঞ্জন ব্যাপারীর কলমে … আমি সেই জাতির মানুষ

  • 11 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 93 view(s)
  • লেখক: কুণাল কান্তি সিংহ রায়

আমি সেই জাতির মানুষ, পুরা কাহিনিতে যাদের চণ্ডাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যাদের ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দুধর্মের খাঁচায় ঢোকাবার উদ্দেশ্যে নাম বদলে নমঃশূদ্র করে দেওয়া হয়। শাস্ত্র বলেছে — শূদ্র মানে দাস। সে তুমি নমঃশূদ্র হও আর নবশূদ্র। যেভাবেই বলা হোক, যে কারনেই বলা হোক — কোন দাস সমাজে সম্মানীয় হতে পারেনা। চাকর বাকরের জন্য যা বরাদ্দ তা তার ভাগ্যে জুটে থাকে ।

আমি সেই জাতির মানুষ, পুরা কাহিনিতে যাদের চণ্ডাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে যাদের ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দুধর্মের খাঁচায় ঢোকাবার উদ্দেশ্যে নাম বদলে নমঃশূদ্র করে দেওয়া হয়। শাস্ত্র বলেছে — শূদ্র মানে দাস। সে তুমি নমঃশূদ্র হও আর নবশূদ্র। যেভাবেই বলা হোক, যে কারনেই বলা হোক — কোন দাস সমাজে সম্মানীয় হতে পারেনা। চাকর বাকরের জন্য যা বরাদ্দ তা তার ভাগ্যে জুটে থাকে ।

অনেকে যেমন গরুর দুধের চেয়ে গরুর মুতকে মূল্যবান মনে করতে শুরু করেছে, ব্রাহ্মণের পা ধোয়া জল [পাদোদক] পেট ভরে খেয়ে স্বর্গে যাবার কামনা করছে, তেমন অনেকে নিজেকে চণ্ডাল ভাবার চাইতে — আমরা নমস মুনির বংশ বলতে —  পৈতাহীন ব্রাহ্মণ বলতে গর্বিত হচ্ছে।

গর্বিত হচ্ছে নিজেকে হিন্দু ভাবতে। যে হিন্দুধর্মের মন্দিরে তার প্রবেশাধিকার নেই। যদি যায়, আর তার জাত পরিচিতি কোন ভাবে প্রকাশ হয় — একটা লাথিও মাটিতে পড়বে না। সব পড়বে কপালে। কারন বর্নবাদী ব্যবস্থার কাছে নমরা দলিত। অচ্ছুৎ অস্পৃশ্য।

দেখছেন তো সারাদেশে দলিতদের কী করা হয়? কী করে তাদের উচ্চবর্নরা? ঘোড়ায় চড়লে পিটিয়ে মেরে ফেলে, পায়ে চপ্পল মাথায় ছাতা দিলে পিটিয়ে হাড় গোড়ভেঙ্গে দেয়। কম মজুরিতে কাজ না করতে চাইলে বুক সোজা গুলি চালিয়ে দেয়। রেপ করে গলায় দড়ি বেঁধে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয় ।

আমাদের ভাগ্য কিছু ভালো যে বাংলায় নব জাগরন হয়েছিল। অনেক সমাজ সংস্কারক মনীষীর জন্ম আর কর্মভূমি বাংলা। যার ফলে গোবলয় এখানে পাঞ্জা তেমন কষতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে বামপন্থী আন্দোলন — চিন্তা চেতনা তাদের পথ আটকাতে পেরেছে। তা না হলে সেই যেমন দেশের অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজও বিধান আছে, অন্ত্যজ শ্রেনীর কেউ বিয়ে করলে তিন রাতের জন্য বউ উঁচু জাতের বাড়িতে পাঠিয়ে শুদ্ধি করে আনতে হবে — এখানেও সে নিয়ম চালু হতো।

সে চেষ্টা তাদের বহুকাল ধরে চলছে। যা চলছে তাতে মনে হয় তেমন দিন আসতে আর খুব বেশি দেরী নেই। আজ অনেকাংশে সফল তারা! আসছে — ব্রাহ্মন্যবাদী রাজ আসছে ।

বিশাল সংখ্যক একদল মানুষ যাদের ছিল অসম্ভব প্রানশক্তি, যারা যেকোন প্রতিকুল অবস্থার মধ্য থেকে আহরন করে নেবার ক্ষমতা রাখতো বেঁচে থাকার উপকরন। কোন কঠিন অবস্থার কাছে যারা কোনদিন হার মেনে নিতে জানে না।

আপনাদের অনেকের হয়ত জানা নেই সেই যে বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল যাতে বাংলার তিরিশ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মারা যায়, তাতে আমাদের এই জাতির মানুষ মারা গিয়েছিল সবচেয়ে কম। কারন নদী নালা ছেঁচে মাছ ধরে, নিত্য নতুন খাদ্য আবিষ্কার করে তারা তাদের বাঁচিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কচু যে একটা খাবার জিনিস হতে পারে, শালুক খারকোল কলার থোর ডুমুর যে একটা খাদ্য বস্তু, সব তাদের আবিষ্কার ।

আপনাদের অনেকের জানা আছে যে দেশভাগের পর এই সব মানুষগুলোকে ভারতবর্ষের আঠারোটা প্রদেশে ‘নির্বাসিত’ করা হয়েছিল। পাহাড় পাথর জঙ্গল ঘেরা সেই সব অঞ্চল। হিংস্র জন্ত জানয়ারের বাস। যেখানে জল নেই মাটি রুক্ষ, আবাগমনের পথ নেই, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না। আন্দামান দণ্ডকারন্য যে সব জায়গার নাম শুনলে বুক কেঁপে যায়। কে জানে হয়ত ব্রাহ্মন্যবাদী রাজনেতারা ভেবেছিল ওখানে যদি ওঁরা বাঁচতে পারে বাঁচুক। না পারলে লোকচক্ষুর আড়ালে মরে যাক। কিন্ত তারা  মরেনি। সেই নির্দয় পাথর ফাটিয়ে বের করেছে জল। কৃপন অহল্যা ভূমিকে শ্রমে ঘামে করে তুলেছে শষ্য শ্যামলা। বাধ্য করেছে অনুর্বর প্রকৃতিকে ফসল প্রসব করতে ।

আজ যে কেউ গিয়ে দেখে আসতে পারে — তারা সেখানে অনেক ভালো আছে। এমন কী এই বাংলার কৃষকদের চেয়েও ভালো আছে। এই যে আমি — বাংলায় পেট ভরে খেতে পারিনি আজ আমার ঘরের উঠোনে পড়ে থাকে দেড়শো দুশো বস্তা ধান।

এই যে এদের এত প্রানশক্তি, অমনীয় জেদ, হার না মানা প্রবৃত্তি, একে কেউ যদি সমাজ বদলের দিশায় ব্যবহার করতে চাইতো —  দেশ সমাজ আজ অন্য রূপ নিতে বাধ্য হতো। অনেক কিছু ছিল এদের। কিন্ত  ছিল না একজন যোগ্য নেতা। তা যদি থাকতো এই বিপুল সাহস শক্তিকে প্রয়োগ করে — ইহুদিদের মত নিজের দেশ না হোক — এই দেশের মধ্যে আমরা পেতে পারতাম নিজেদের জন্য একটা সম্মানীয় স্থান।

নেতা আমাদের ছিলনা, অথচ ছিল কিছু ধুর্ত গুরুগিরি করা বদ লোক। যারা এই সমাজকে আগাতে তো দিলই না, উলটে পিছন দিক থেকে টেনে ডুবিয়ে দিল কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস অবৈজ্ঞানিক কুম্ভিপাকে। অলীক এক প্রাপ্তির পিছনে ছুটিয়ে গোটা জাতিটার জীবনী শক্তি ক্ষয় আর দুর্বল করে দিল।

যদি এই সমাজে একজন জাতি দরদী জননেতা জন্ম নিতো, যে আঠারো মাস সময় নিয়ে আঠারোটা প্রদেশে স্বজনদের মধ্যে বাস করে আঠারোজন যুবনেতা নির্মান করতো। সেই আঠারোটি প্রদীপ আবার সারাদেশে ঘুরে ঘুরে আঠারো শত, আঠারো হাজার, আঠারো লক্ষ, আঠারো কোটি প্রদীপ জ্বালাতো — যেমনটা কাশীরামজি শুরু করে ছিলেন — তাহলে আজ গোটা দেশের দলিত দরিদ্র মানুষের শোষণ শাসন দমন দলনের বিরুদ্ধে এই জাতি নেতৃত্ব দিতে পারতো। প্রতিষ্ঠিত করতে পারতো নিজেদের এক নির্নায়ক শক্তিকেন্দ্র হিসাবে।

তা যদি হোত আজ তাহলে তাদের আর ব্রাহ্মন্যবাদী দলের পা চাটতে হতো না একটা এম এল এ, এম পি পদ পাওয়ার জন্য। কংগ্রেসের পা চেটেছে আগে, তারপর সিপিএম তারপর তৃণমূল আর এখন বিজেপি! চাটতে কোন পা আর বাকি থাকলো না। এই পদলেহী পদলোভী সিকি আধুলি নেতা আমাদের জাতির কলঙ্ক, লজ্জা।

 

0 Comments
Leave a reply