বিশ্বেন্দুর আড়ং ধোলাই

  • 02 August, 2020
  • 1 Comment(s)
  • 195 view(s)
  • লেখক: অনুরূপ ভৌমিক

কেন আমরা পড়া ছেড়ে আপনাদের ভাষায় ড্রপআউট হই? 

এ লড়াই আজও আছে থাকবে, যতদিন না, শিক্ষা আঞ্চলিক হয়

এই যে লুঠ নিশ্চিত করার জন্যে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্যে বিভেদ তৈরি করার জন্যে ইসলামোফোবিয়া ছোটলোকফোবিয়া এবং ভদ্রলোক তৈরির জন্যে ২০০ বছর ধরে ঔপনিবেশিক ভদ্রলোকিয় যে পাঠতন্ত্র তৈরি করলেন, তাতে আপনারা আমাদের, অভদ্রলোকেদের অংশ নিশ্চিত করতে চাইছেন, সেটা আমরা হতে দিই নি আজও দেব না।

এই পাঠ্যক্রম মূলত আন্তর্জাতিকস্তরে করপোরেট সেবাদল তৈরি করার জন্যে এবং প্রথমে ইওরোপিয় আজ যৌথভাবে ইওরোপিয়-আমেরিকিয় স্বার্থ বজায় রাখার জন্য তৈরি হয়েছে। আমাদের একটা বড় অংশ বাংলা তথা পূর্বাঞ্চলে একদা যে বিদ্যালয়ী কাঠামোয় পাঠ্যক্রমিক পড়াশোনা করতাম, এবং ভদ্রদের থেকে বেশিই করতাম, তার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় অর্থনীতিতে অংশ গ্রহণ। যেদিন থেকে মেকলে+বিদ্যাসাগর এবং অন্যান্য ভদ্র, দেশিয় পড়াশোনা তুলে দিয়ে করপোরেট প্রাধান্যযুক্ত কেন্দ্রিভূত ভদ্রলোকিয় পড়ার পরিবেশ তৈরি করলেন, সেদিন থেকে আমরা ড্রপড আউট হতে শুরু করেছি। আপনাদের ড্রপডআউট বিরোধী হাজারো পরিকল্পনা মাঠে মারা যাচ্ছে কারণ আপনারা গোড়া কেটে আগায় জল দিচ্ছে্‌ সামাজিক বাস্তবতাই বোঝেন না, যা পরিবর্তন হচ্ছে মূলত এই কাঠামো বজায় রেখে ইতিউতি ঝাড়াইপোঁছাই।

আমরা সেদিন থেকেই জানতাম এটা আদতে ভদ্রবিত্তিয় প্রকল্প। আমরা  যে কেন্দ্র বিরোধী বিদ্যালয় কাঠামো গড়ে তুলেছিলাম, যেখানে নজরদারি ছিল না, সেটা ধ্বংস হয়ে গেল উপনিবেশিক মহামহিমদের চাপে, সাম্রাজ্যের সেবাদাস তৈরির জন্যে। বিদ্যালয়ে আমরা ঠিকঠাক  পড়ছি কী না, আমাদের দেওয়া রাজস্বে কাঠামো বজায় আছে কী না দেখতে হয় ঢাকা বা কলকাতা না হয় দিল্লি আজকাল লন্ডন নিউইয়র্ক থেকেও পরিদর্শক পাঠান, যাদের আমার আশেপাশের বাস্তবতা চেনার জানার দায় নেই - শুধুই আন্তর্জাতিক করপোরেট স্বার্থ প্রতিপাদন লক্ষ্য, অথচ আমাকে  আশেপাশের ভাষা অর্থনীতি কৃষ্টি মানুষ মেলা ইতিহাস এই সব নিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। আপনার পাঠ্যক্রমেকে তো এগুলোর কিছুই নেই। তাই আমরাও নেই হয়ে গিয়েছি।

যে পাঠের সঙ্গে কেন্দ্র নামক শব্দ জুড়ে আছে সেই ব্যবস্থার অংশ হতে চাই না। অথচ আপনারা ভদ্রবিত্তরা গত দেড়শ বছর ধরে এমন একখানা হাওয়া তুলেছেন এই কেন্দ্র নির্ভর পাঠ্যক্রম সর্বরোগহর এবং এমন সামাজিক চাপ তৈরি করেছেন যে আমরা পাঠ্যকেন্দ্রে না গেলে প্রগতি বিরোধী দাগিয়ে দিয়ে হয়ত জেলেই পুরে দিতে পারেন। তাই আমরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পাঠকেন্দ্রের আসি, কিন্তু বুঝতে পারি এই পড়াশোনা আমার পরিবারের স্বার্থ রক্ষার জন্যে নয় - তাই ক্রমশ ছেড়ে দিতে শুরু করি।

পশ্চিমবাংলায় প্রাথমিকে যে বিপুল ২৫ লক্ষ ভর্তি হয় তার মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ ১ লক্ষ ভদ্রলোকের ঘরের ছানাপোনা, বাকিটা আমাদের - এবং এই পাঠ্যক্রম তৈরির উদ্দেশ্য ভদ্রলোকিয় কর্পোরেট স্বার্থ সম্পাদন। ব্যবস্থাটা বুঝতে শুরু করা মুহূর্তে আমরা ক্রমশ খসতে শুরু করি - প্রাথমিক থেকে স্নাতক স্তর অবদি। মাথায় রাখুন স্নাতকে পরীক্ষা দেয় শুধুই ৮০ হাজার - অর্থাৎ মূলত ভদ্রলোকেদের সন্তানদের পড়াশোনার কোটা পূরণ করা হল। আমরা সব খসে গেলাম।

ড্রপআউট আমাদের একটা বর্ম - যতটা কর্পোরেট পড়াশোনার বাইরে থাকা যায় তার প্রাণপন চেষ্টা।

এ লড়াইও আজও আছে থাকবে, যতদিন না, শিক্ষা আঞ্চলিক হয়।

1 Comments
  • avatar
    Runa

    18 August, 2020

    আমরা, শিশু থেকে বড়, সবাই শিখি নিজের তাগিদে। আমরা, ছোটলোক বা বড়লোক হই, শেখাটা এবং তার ব‍্যবহারও নিজের তাগিদে। এখানে 'শেখা' সবার জন্যেই সমান অধিকার, স্কুল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, চাই অন্তরের তাগিদ, নকল নয়। এটা বুঝে গেলে আর কেউই 'ড্রপ আউট' হবে না। আর মনেও সংশয় থাকবে না।

Leave a reply