বিভাজনরেখা : ২৯ তম বর্ষ; ২১ আশ্বিন ১৪২৭; অক্টোবর ২০২০

  • 07 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 76 view(s)
  • লেখক: তবু বাংলার মুখ

আমরা যারা নিজেদের সাধারণ মানুষ, আমজনতা ইত্যাদি বলে মনে করি, হয়ে উঠতে চেষ্টা করি—তার নির্দিষ্ট কিছু অভিসন্ধি থাকলেও মূলত আমরা কেউই সাধারণ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। চাই একটা কিছু অন্তত ভিন্ন পরিচয় থাকুক। বুঝি না-বুঝি কোনো না কোনো ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের সকলের ন্যূনতম চাহিদা হল সুস্থ সবল মাথা উঁচু করে বাঁচার এক পরিবেশ। এমন এক সাধারণ ব্যক্তি আজকের ফ্যাসিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি বলে, আমাদের দুর্দশা কেউ ঘোচাতে পারবে না। সব রাজনীতিবিদরাই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, কোনো দলকে ভরসা নেই—অমনি কথা ওঠে, মশাই, রাজনীতি ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে নাকি? এই যে আপনি রাজনীতির আবহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছেন—এও আসলে এক রাজনৈতিকতা।

আমরা যারা নিজেদের সাধারণ মানুষ, আমজনতা ইত্যাদি বলে মনে করি, হয়ে উঠতে চেষ্টা করি—তার নির্দিষ্ট কিছু অভিসন্ধি  থাকলেও মূলত আমরা কেউই সাধারণ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। চাই একটা কিছু অন্তত ভিন্ন পরিচয় থাকুক। বুঝি না-বুঝি কোনো না কোনো ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের সকলের ন্যূনতম চাহিদা হল সুস্থ সবল মাথা উঁচু করে বাঁচার এক পরিবেশ। এমন এক সাধারণ ব্যক্তি আজকের ফ্যাসিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় যদি বলে, আমাদের দুর্দশা কেউ ঘোচাতে পারবে না।  সব রাজনীতিবিদরাই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, কোনো দলকে ভরসা নেই—অমনি কথা ওঠে, মশাই, রাজনীতি ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে নাকি? এই যে আপনি রাজনীতির আবহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছেন—এও আসলে এক রাজনৈতিকতা।

    বাস্তবিক ঘটনাও তাই, আমাদের সাধারণ মানুষ হিসেবে মেনে নেয়ার আজ আর কোনো কারণ কেউ খুঁজে পাবে না। কেননা আমরা একেকজন নির্দিষ্ট খোপ দ্বারা বিভাজিত। সেই খোপগুলি হল বিভিন্ন দরের রাজনৈতিক ক্ষমতার এলাকা। খোপগুলি হল নানারকম ধর্মীয় মতবাদের এলাকা। জাত বর্ণ বর্গ সংস্কার সম্প্রদায় ভয় ভক্তি বিশ্বাস অবিশ্বাস ছুত অচ্ছুত ইত্যাদির গাঢ় চিহ্নিত এলাকা। আজ যখন দেশের আমজনতা জীবনের অস্তিত্বরক্ষার চরমসীমায় পৌঁছে গিয়েছে, তখন এই বিভাজনরেখাগুলি স্পষ্টতর হয়ে উঠছে।

    তলিয়ে দেখলে বুঝব, এই বিভাজনরেখা স্পষ্টতর করার পেছনে হাত রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা। তারা আমজনতার মঙ্গল করার কথা বলে চিরকালই নিজেদের দল তথা নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে পুষ্ট করেছে। এবং এভাবেই তারা ভোট বৈতরণী পেরিয়ে আঠার মতো সেঁটে থেকেছে সিংহাসনে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর।

    এই রাজনৈতিক ক্লাবগুলি (দল বলতে পারা যাচ্ছে না ) যদি আমজনতার প্রতিনিধিত্ব করতে চাইত তাহলে প্রথমেই আমজনতার নির্বোধতার সুযোগ নিয়ে শাসন-শোষণ করার বদলে তাদের অধিকারের কথা মনে করিয়ে দিত। দাপটে চোখ রাঙিয়ে কথা বলার বদলে হাত জোড় করে ‘আপনাদের জন্য কী করতে পারি, বলুন’ বলে, সর্বদা সেবা করতে চাইত। পাঁচ লাখ টাকার ফকিরি ল্যাঙ্গোট, চার লাখ টাকার স্লেট, কোটি টাকার হাওয়াই-জাহাজ ইত্যাদি বায়নার জন্য নাকে কাঁদত না। মানুষে মানুষে সাম্য এবং দরিদ্র কৃষক-শ্রমিকের জন্য লড়াই করতে আসা ক্লাবটি মার্ক্স-লেনিনের বাণীর সঙ্গে বেদবিরোধী, মনুবাদবিরোধী উপনিষদের পাঠ নিয়ে মানুষের দরবারে হাজির হতে পারত। লেনিনের সঙ্গে লালনের চৈতন্যের বা মোহম্মদের মতবাদের যে কোন অমিল নেই, তা যে আসলে সমগ্র মানবজাতির—তা তারা ভুলে যেত না। যেন তাঁরা শুধু নির্দিষ্ট ধর্মের অবতার! ধর্ম আর মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার অধিকার যাদের ছিল, ধার্মিকতা আর ধর্মান্ধতার প্রভেদ যাদের চর্চার বিষয় ছিল, সংস্কৃতি আর অপসংস্কৃতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত যারা ছিল, তারা অস্ত্র তুলে দেয় ধর্মব্যবসায়ীদের হাতে, দেশদ্রোহীদের হাতে। কেন দেয়? সে-ও ঐ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। ফলে ধর্মের নামে তোষণ, রাজনীতির এক মূল্যবান ক্রাইটেরিয়া হিসেবে ফিরে আসে। গেঁড়ে বসে।

   আমি যখন বললাম, সিঙ্গুর হল হাজার যুবকের কর্মসংস্থান, তুমি বললে, চাষের জমি এভাবে ধনী ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দেয়া জনবিরোধী কাজ। আমি যখন বললাম, গুজরাত হত্যাকাণ্ডে কয়েক হাজার মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। তুমি তখন বললে, কাশ্মীরে যখন হিন্দু পণ্ডিতদের মেরে, পুড়িয়ে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল—তখন কোথায় ছিলে? আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, বেসরকারি হাসপাতালে কেন লক্ষ লক্ষ টাকার বিল হয় সামান্য জ্বর-জাড়ির চিকিৎসায়? তুমি বললে, তোমরা তো দীর্ঘ রাজত্বকালে এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়ে এই পর্যায়ে এনে ফেলেছিলে! আমি যখন দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্যে চিৎকার করছি, তুমি বলছ এ হল গদ্দার, দেশদ্রোহী। আমার ভাই, দেশবাসীকে যে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারছে, তাকে তুমি পুরস্কৃত করছ আর আমাকে পাঠাচ্ছ জেলের গরাদের পেছেনে। আমি যখন শিক্ষকের দাবি-দাওয়া নিয়ে ধর্না দিচ্ছি, অনশন করছি, তখন ফলমূল এনে খাওয়াচ্ছ। যখন আমাদের হোটেল থেকে তাড়িয়ে দেয়, তুমি নির্বাক থেকে খুঁজছ, আমাদের ছাতা এক কি না!

   এইসমস্ত বিভাজন-ভাবনা আমজনতার কাছ থেকে উঠে আসা। এগুলির সত্যি মিথ্যা হয় না, ভালো মন্দ হয় না। আসলে এগুলো সময়- নিরপেক্ষ নয়। দীর্ঘ যুগ আগে ঘটে যাওয়া অথবা ঘটানোর পচা পাঁশ ঘেঁটে উদ্ধার করে আনা হচ্ছে যুক্তি-কুযুক্তির মডেল। অথচ জনতা জানেই না, এগুলো মূল পরিত্রাণের কথা বলে না। কথাগুলো নয় তাদেরও। ফলে আমরা-ওরা কখনওই একত্রে শোষকের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারি না। আমরা ভাবতে পারি না, যে-শক্তির হয়ে কথা বলছি, আসলে সে ক্ষণস্থায়ী বুদবুদ মাত্র। আমরা ভাবতে পারি না, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আসলে আমাদের সেবক, দাস। উলটে ভাবতে শিখেছি, আমরা জনতা, প্রবল শক্তিধর হলেও নেতাদের দাস! সুতরাং যা পারি, তা হল আমার ভাইএর বিরুদ্ধে যুদ্ধ, লাঠালাঠি, গুলি, হত্যা...ভাবি, এতেই দেশের কল্যাণ!

   ধার্মিকতা যে আমাদের দেশের নিরক্ষর জনতার কাছে আশীর্বাদস্বরূপ, একথা জানার পরও সামান্য ধর্মের ছোঁয়া থাকলেই সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া, আসলে যে আমজনতার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া –তা বোঝা উচিত ছিল। যে-সব সুচেতনা শিক্ষিতের অহংকার, তার চোঁয়ানি আমজনতার মধ্যে পৌঁছোতে গেলে কী ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং সচেতনতা বাড়ানো দরকার, কী প্রচণ্ড অনুশীলন দরকার, তা না দেখে কেবল স্লোগানে স্লোগানে দেয়াল ভরিয়ে তুললে কাজের কাজ কিছুই হয় না। ক্লাব-ভক্তের সংখ্যা বাড়ে কেবল, মালামাল হতে সুবিধা হয়, ভবিষ্যতে যাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এক ক্লাব থেকে অন্য ক্লাবের দাস হিসেবে নাম লেখায় তারা। আমজনতার বিভাজন বৃদ্ধি পেতে থাকে। ছাতার পর ছাতা বাড়তে থাকে। একে সমাজবোদ্ধারা গণতান্ত্রিক বিকাশ  বললেও কথা ওঠে—যে যায় লঙ্কায়, আজকের দিনে, সেই কি রাবণ হয়ে ওঠে না? সত্যিই কি বিবিধ গণতান্ত্রিক বিকাশে জনসাধারণের জন্যে কোনো ঐক্য তৈরি করা গিয়েছে? রাজনৈতিক মানুষ কখনওই আমজনতার মঙ্গলের কথা ভাবতে পারে না। যে যার দলীয় ভাবধারার চশমার ভেতর দিয়ে বাস্তব সমস্যাগুলিকে দেখে, বিচার করার চেষ্টা করে। তাই আমরা যখন শাসকের জনবিরোধী ভূমিকা দেখি, তখন একদল সোচ্চার হই তো আরেকদল চুপ করে থাকি। রাজনীতির ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘জল মাপা’। ভদ্র নেতাদের স্ট্রাইক ডাকা দেখে ইলিয়াসের বিপন্ন ছোটোলোক চরিত্র, হাড্ডি খিজির চেঁচিয়ে বলে উঠেছিল, ইস্টাইকের মাকে...!

   এসব কথা আজকের দিনে এইজন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে যে, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শকেই আর মানুষ বিশ্বাস করতে চাইছে না। চাইলে, মস্ত খারাপের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালো নেতা বা ভালো দল বা ভালো মতাদর্শের খোঁজ আমরা রাখার চেষ্টা করতাম। একে ওপরের পেছনে লেগে তৃতীয় পক্ষের ঘোষিত ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের পথ সুগম করে দিতাম না।

    সাধারণ মানুষ আর অসাধারণত্বে ভরসা পায় না। সে এবার সত্যিসত্যিই ঐকমত্যে পৌছানোর তাগিদে জনসাধারণ হিসেবে প্রশ্ন করে, সন্তানকে মারধোর করে চোখ রাঙিয়ে দাসে পরিণত করলে কি সে সুসন্তান, সুনাগরিক হয়ে ওঠে, পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় , না ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়ে সুখ-দুঃখ অনুভব করতে পারলে কাজ হয়! দেশের মানুষকে যারা কখনও সুনাগরিক, অধিকার সচেতন, শিক্ষিত না করে কেবলই অশিক্ষা অনাহার দারিদ্র আর দাসত্বের শেকল পরাতে চেয়ে নিজেদের ছ-আট-দশ পুরুষ করেকম্মে খাবার আয়োজনে মত্ত থাকে আর কোটি কোটি দেশবাসী যখন মৃত্যুর বুকে ঢলে পড়ে প্রতিনিয়ত—তখন আমজনতার দীর্ঘ ধৈর্যের বাঁধ পলকা সুতোর মতো ছিঁড়ে যেতে বাধ্য।

   করোনা নামক অতিমারীতে লক্ষ মানুষের মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে, সিঁদেল চোরের মতো সুযোগ নিয়ে যারা একের পর এক মানব-বিরোধী বিল পাস করিয়ে নিচ্ছে, মানুষকে পশুর জীবনে বদলে ফেলার আনন্দে যারা মেতে আছে, দেশকে কর্পোরেটদের হাতে বিকিয়ে দিচ্ছে যারা, কৃষক-শ্রমিকদের আত্মহত্যার মুখে যারা ঠেলে দিচ্ছে--তাদের সিংহাসন থেকে টেনে হিঁচড়ে না নামাতে পারলে হাড্ডি খিজিরদের থামা নেই। কোনো বাণী বা তত্ত্বই তাদের আর আজ কাজে আসবে না, মনুষ্যত্ত্বের তত্ত্ব ছাড়া।

“মাতা কয়, ওরে চুপ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে দেখ চেয়ে!

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন...

কচি পেটে তার জ্বলে আগুন...”

0 Comments
Leave a reply