পুণে-র ইয়েরাওয়ারা জেলে বন্দী কবি ওয়রওয়রা

  • 02 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 116 view(s)
  • লেখক: তবু বাংলার মুখ

পুণে-র ইয়েরাওয়ারা জেলে বন্দী কবি ওয়রওয়রা রাও গুরুতর অসুস্থ। গত ক’মাসে এই অশীতিপর মানুষটির ওজন কমেছে ১৩ কিলো! বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে জেল সাক্ষাৎ, চিঠিপত্র। কবিপত্নী হেমলতা এক সপ্তাহে দু’মিনিট মাত্র কথা বলতে পারছেন।

আমাদের এই ‘কবিকে মুক্ত কর’ উদ্যোগকে দ্রুততর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা আরও উদ্বিগ্ন হয়েছি দেখে, অধ্যাপক আনন্দ তেলতুম্বড়ে-কে গ্রেফতারির পরে দেশজোড়া আওয়াজ না ওঠায়। রাষ্ট্র এই লকডাউনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার নিজস্ব আ্যজেন্ডাগুলিকে কার্যকরী করে নিচ্ছে। এখন আর নিষ্ক্রিয় থাকলে চলবে না। এই পরিস্থিতিতে আমরা ১০ জন ‘কবিকে মুক্ত কর’ আহ্বানটির পুনঃপ্রচার করা খুবই জরুরি মনে করছি।

কবিকে মুক্ত কর।

মুক্ত কর অন্ধকারের এই দ্বার।

প্রথম কবিতার বই ‘চালি নেগালু’ (ক্যাম্প ফায়ার) বেরিয়েছিল ১৯৬৮-তে। শেষ সংকলন ‘বীজভূমি’ ২০১৪-য়। এই অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে পাঠকের কাছে কবি ওয়রওয়রা রাও পরিচিত হয়ে উঠেছেন প্রতিরোধের কবিতার এক অগ্রণী মুখ হিসাবে। যাঁরা তার কবিতার সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁরাও আজকে তাঁর নাম জানেন — জার্মনির রাইখস্ট্যাগ ট্রায়ালের আদলে সাজানো ভীমা কোরেগাঁও ও প্রধানমন্ত্রী হত্যা চেষ্টা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত একজন বন্দি হিসাবে (বন্দিত্ব অবশ্য তাঁর কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়, বর্ষীয়ান এই কবি সেই ১৯৭৩ থেকে গ্রেফতার হয়েছেন, বহু দফায় কারাবন্দী থেকেছেন বহু বছর, যতদিন এ’দেশের আর কোনও কবিকে থাকতে হয় নি)। আর যাঁরা তাঁর কবিতাকে জানেন, তাঁদেরও সকলে হয়তো জানেন না তেলুগু সাহিত্যে আলোচক ও প্রাবন্ধিক হিসাবে তাঁর জায়গা কতটা উঁচুতে।

তেলুগু সংস্কৃতিতে মৌখিক ভাষ্য বিষয়ে তাঁর পোস্ট ডক্টরাল পেপার, এবং পরবর্তীতে তাঁর থিসিস ‘তেলেঙ্গনা মুক্তিসংগ্রাম ও তেলুগু উপন্যাস : সমাজ ও সাহিত্যের আন্তঃসম্পর্কের একটি পাঠ’-কে সমকালীন মার্কসীয় সাহিত্যচর্চায় মাইলফলক বলে ধরা হয়। ১৯৬৬ থেকে ‘৯২, ওয়রওয়রা রাও প্রতিষ্ঠিত ও সম্পাদিত ‘স্রুজনা’ পত্রিকা আধুনিক তেলুগু সাহিত্য চর্চার সবচেয়ে মননশীল সাময়িকী বলে বিবেচিত হয়েছে। সমকালীন বিশ্ব প্রতিরোধ সাহিত্যের সঙ্গে তেলুগু পাঠকদের পরিচয় করিয়ে গেছেন ধারাবাহিকভাবে, জেলে বসেও অনুবাদ করেছেন কেনিয়ার সাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিংগো-র উপন্যাস ডেভিল অন দ্য ক্রস বা জেল ডায়েরি ডিটেইনড। তাঁর নিজের কারাবাসের দিনলিপি সহচরলু ‘ক্যাপটিভ ইমাজিনেশন’ নামে অনুদিত হয়ে আন্তর্জাতিক পাঠকের সম্ভ্রম আকর্ষণ করেছে।

মার্কসবাদে আস্থাশীল কবি ওয়রওয়রা রাও কোনোদিন তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসকে লুকোতে চান নি, গণতান্ত্রিক অধিকার, ও আরো প্রসারিতভাবে বললে বুনিয়াদি মানুষের অধিকারের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন ও সক্রিয়তা জুগিয়েছেন, সরব থেকেছেন। ১৯৬৭-তে নকশালবাড়িতে ঘটে যাওয়া কৃষক বিদ্রোহ যখন ভারতীয় রাজনীতিতে একটি নির্ণায়ক বাঁকবদল ঘটিয়েছিল, অন্ধ্রপ্রদেশের প্রগতিশীল সাহিত্যকর্মীদের বড় অংশটাই সে সময়ে পক্ষ অবলম্বনে দ্বিধা করেন নি, সেই কাতারের দুই তরুণ মুখ ছিলেন চেরবন্ডা রাজু ও ওয়রওয়রা রাও। ‘৬৭ থেকে আজ, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ওয়রওয়রা রাও ক্রমশ থেকে গেছেন বিদ্রোহের ভাষ্যকার। তাঁর বিদ্রোহের ভাষা শাসকের ঘুম নষ্ট করেছে। জীবনের প্রতি যে আবেগ, যে জীবনীশক্তি এই ভাষার জন্ম দেয় তা ফ্যাসিবাদের পক্ষে তা হজম করা কঠিন। তাই, আজ আশি পেরোন বয়সে বন্দী রেখে, জেল থেকে জেলে ঘুরিয়ে তাঁর জীবনীশক্তিকে নিঙড়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে জেলের বাইরে বের করার আগে তাঁর মৃত্যুশয্যায় শোওয়া নিশ্চিত করা যায়। ঠিক যে পরিণতি হয়েছিল তাঁর বন্ধু ও সহযোদ্ধা চেরবন্ডা রাজুর।

আজ চুপ থাকলে কাল ফ্যাসিবাদের দেওয়াল চারপাশ থেকে চেপে ধরে আমাদেরও শ্বাস বন্ধ করে দেবে। আমরা, পশ্চিমবাংলার কবি, লেখক, শিল্পী ও সম্পাদকেরা চাই বিদ্রোহের কবিতা মুক্ত হোক। তাই আমরা স্পষ্টভাষায় কবি ওয়রওয়রা রাও-এর মুক্তির দাবিতে মুখর হচ্ছি। মুখর হচ্ছি, ভারতের জেলে বন্দী প্রতিটি লেখক, কবি, শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীর মুক্তির সপক্ষে। গলা মেলান আমাদের সাথে, এ আওয়াজ আরও উচ্চকিত হোক। দুঃশাসন শুনুক, তার প্রাসাদের বাইরে প্রতিরোধের কন্ঠস্বর জাগছে, কলরব হয়ে বাড়ছে, রণধ্বনি হয়ে ফেটে পড়ছে ।

এই সময়ে ‘না’ বলতে পারা কবিদের, শিল্পীদের, চিন্তাকর্মীদের খুব দরকার। তাই, কবিকে মুক্ত কর। মুক্ত কর অন্ধকারের এই দ্বারকে।

শঙ্খ ঘোষ

সব্যসাচী দেব

কবীর সুমন

হিরণ মিত্র

কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বপন দাসাধিকারী

রাহুল পুরকায়স্থ

শুদ্ধব্রত দেব

বিপ্লব ব্যানার্জী

সোমরাজ শূর

দেবাশিস মৈত্র

পার্থপ্রতিম মৈত্র

অসিত রায়

0 Comments
Leave a reply