পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কি আসবে?

  • 06 August, 2020
  • 1 Comment(s)
  • 286 view(s)
  • লেখক: মনোরঞ্জন ব্যাপারী

আপনি খুব ভাল লোক, সৎ লোক, আপনার বুকে খুব দয়া দরদ। যুদ্ধ তো অনেক দূরের ব্যাপার, আপনি যদি কারও সঙ্গে দাবা খেলতে বসেন — এই সব মহৎ গুন আপনার কোন কাজে আসবে না। মাত্র সেই গুন কাজে আসবে যদি আপনি ভাল চাল দিতে জানেন। রাজনীতিতে এই কথাটা অনেক বেশি সত্য ।

পশ্চিম বঙ্গের নির্বাচনী রন দামামা বেজে গেছে। এটা এক ধরনের যুদ্ধ। প্রত্যেকটা দল যে যার চাল চালতে শুরু করেছে। কেউ জিতবার জন্য, আর কেউ জিততে না পারি — হারিয়ে দেবো সেই জন্য। প্রধানতঃ প্রতিপক্ষ এখানে মাত্র দুই — বিজেপি ও তৃণমূল। দেখে শুনে মনে হচ্ছে বিজেপি জিতবার জন্য যে সব চাল চালছে তার সামনে তৃণমূল দল কোন থৈ পাচ্ছে না। বিজেপির চালগুলো যেন দাবার বোর্ডের ঘোড়ার চালের আড়াই ঘরের মত প্যাঁচালো ।

যে পথ পদ্ধতিতে ওঁরা ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে গিয়ে ভোটের প্রচার করছে, তার ফলাফলে ভোট বাক্স ভরে ওঠার আশা ওঁরা করতেই পারে। কী ভাবে প্রচার চালাচ্ছে ওদের দলের লোকেরা — আমি চারদিক থেকে যে সব খবর পাচ্ছি তার কয়েকটা এখানে রাখলাম। যার কতটা সত্য কতটা নয়, আপনারা নিজেদের মত করে ভেবে বুঝে মিলিয়ে দেখে নিতে পারেন ।

১)   ওঁরা প্রচুর পরিমানে লোক ইউপি বিহার থেকে এনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার লিষ্টে নাম তুলে দিয়েছে। যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বহু আগে থেকে। যে কাজে তৃনমুলের লোকাল নেতারাই দশ বারো হাজার দাম পেয়ে সহায়তা দিয়েছে। যার ফলে, আমার দেখা —  বাইপাশ থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে — ভগবানপুর মৌজায় প্রায় ৩০/৩২টি  জনবসতির এখন প্রায় প্রতি পাড়ায় অর্ধেকের বেশি হিন্দিভাষী। যারা এই সরকারের সব সুযোগ সুবিধা তো নিয়েছে, কেউ কেউ তৃণমূল পার্টি অফিসে গিয়ে সন্ধ্যে বেলায় বসেও, কিন্তু তারা না তো সিপিএম কে ভোট দেবে, না তৃনমুলকে। সব ভোট যাবে জয় শ্রীরামের নামে।  এদের কারনেই গত লোকসভার ভোটে এখানকার একটা বুথেও তৃণমূল দল জিততে পারেনি। এমন কৌশল নাকি গোটা বাংলা জুড়ে রচনা করা হয়েছে । 

২)   গত কুড়ি পঁচিশ বছর ধরে যে সব বাংলাদেশী এপাড় বাংলায় এসে বসবাস করছে তাদের মনের মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে উগ্র মুসলিম বিদ্বেষ। প্রচন্ড লোভ আর লালসা। পরিকল্পিত ভাবে সেই বিদ্বেষ লালসাকে চাগিয়ে তোলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে —  বিজেপি - মুসলমানদের ভারত থেকে তাড়াবে। আর তাদের যে জমি জায়গা সব কেড়ে নিয়ে হিন্দুদের মধ্যে বিলি বন্টন করে দেওয়া হবে। এই লোভে এরাও বিজেপিকে ভোট দেবার জন্য নাচছে। নাচাচ্ছে কিছু গুরু গোঁসাইরা। যদি ইভি এম এর বোতাম টেপার সময় আসামের কথা এদের মনে না পড়ে, ডিটেনশান ক্যাম্পে যাবার ইচ্ছা থাকে, এদের ভোট অবশ্যই বিজেপির বাক্সে যাবে ।

৩)   যারা এখানকার স্থানীয় মানুষ — যাদের বলা হয় ঘটি বাঙালী, তাদের কাছে বিজেপির বিহারী প্রচারকরা গিয়ে বলছে —  বাঙালরা এখানে এসে তোমাদের চাকরি ব্যাবসা শিল্প সাহিত্য রাজনীতি — সব কব্জা করে ফেলেছে। আসামে যেমন করা হয়েছে — এখানেও এন আর সি করে বাঙালদের বাংলাদেশে পাঠাব। আমাদের ভোট দাঁও। তোমরাও ভারতবাসী আমরাও ভারতবাসী —  বাঙালরা সব হচ্ছে বহিরাগত ।

যদি এরা ভুলে যায় যে গোবলয়ের কোন দল নেতাই মছলিখোর বাঙালীদের পছন্দ করে না, যদি একবার ক্ষমতায় ওঁরা এসে যায় বাঙালীদের হিন্দু মুসলমান, বাঙাল ঘটিতে বিভাজিত করে – লড়িয়ে শক্তিহীন করে দিতে পারলে তারপর নিজেদের খেল খেলবে। তখন তাদের হিন্দিভাষীদের পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে হবে। এখনই নিঃশ্বাস নিতে পারছে না তখন কী হবে! তাহলে এদের ভোটও বিজেপির বাক্সে পড়বে । 

৪)   সাধারন হিন্দিভাষীদের কাছে তো এই প্রলোভন আছেই, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ভোটে জিতলে ‘হামারা রাজ হোগা’। হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্থান। এখানকার চাকরি ব্যবসা ভুমি জমি সব তারা দখল করে নেবে। তাদের বোঝানো হচ্ছে — মুসলমানদের আলাদা দেশ আছে — তারা সব যাবে পাকিস্থান। আর যারা বাংলায় কথা বলে — সব বাংলাদেশী। এরা যাবে বাংলাদেশ। রহেগা স্রেফ হামলোগ। 

তখন যদি এরা ভুলে যায় যে লক ডাউনের সময় সারাদেশ থেকে যখন পরিযায়ী শ্রমিক — বিহার ইউপিতে ফিরতে চেয়েছিল তাদের সঙ্গে কী ব্যবহার করা হয়েছে। কী ভাবে নিজের ঘরে ফিরতে চাওয়ার অপরাধে – নিজের সন্তান সন্ততির মুখ দেখতে চাওয়ার অপরাধে রাস্তায় ফেলে গোরু চোরের মত পেটানো হয়েছে। হিন্দিভাষী, হিন্দু বলেও রেহাই দেওয়া হয়নি। তাহলে কিন্ত এদের ভোটও বিজেপির ঝুলিতে যাবে।

৫)   মুসলমানদের কাছে গিয়ে বলা হচ্ছে — সব ফালতু কথা! কে তোমাদের তাড়াবে? কেন তাড়াবে? তোমরা তো এদেশের আদি বাসিন্দা। বাপ দাদার আমলের কিছু না কিছু কাগজপত্র তোমাদের কাছে তো আছে! বাস্ত জমির দলিল, খাজনার রসিদ! তাহলে ভয় কিসের? আমরা তো তাড়াবো ওই বাংলা দেশীদের — যাদের কোন কাগজ নেই। ওদের মধ্যে অনেকে মুসলমান । নাম বদলে হিন্দু হয়ে বসে আছে। আমরা যদি সব মুসলমানদের সাথে ওই করবো তাহলে আমাদের দলে এত বড় বড় মুসলমান নেতা কী থাকতো? জানো আমাদের একটা সংখ্যালঘু সেল আছে? যাতে হাজার হাজার মুসলমান! বলা বাহুল্য এই কথার পরে অনেকজন গিয়ে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছে। বিজেপির হয়ে মারামারি করে মারাও যাচ্ছে ।

ভোট দেবার সময়ে যদি এদের মনে না পড়ে গুজরাতের কথা, যদি ভুলে যেতে পারে দিল্লিতে এই কয়েকদিন আগে কী বীভৎস ভাবে তাদের মারা হয়েছিল — ক্ষমতায় এলে এখানে তা হবে না এমন কোন গ্যারান্টি নেই! তাহলে তাদের ভোটও বিজেপির বাক্সে।

৬)   গত ভোটে দেখা গেছে সব সরকারি কর্মচারীদের পোষ্টাল ব্যালট বিজেপির পক্ষে গেছে। এরা সব চাকরি পেয়েছে সিপিএম আমলে — সিপিএম এর দয়ায়। সেই সিপিএম কে তৃণমূল ভোটে হারিয়ে দিয়েছে। দিদির উপর রাগ হওয়া তো স্বাভাবিক। আবার দিদি ডিএ টাও দাবী মত দিচ্ছে না। সেই রাগ থেকে — আশা করা যায় এদের ভোট বিজেপিই পাবে।

তবে ভোট দেবার আগে এদের মনে রাখা চলবে না যে- বিজেপি কিন্ত ধীরে ধীরে সব সরকারী বিভাগ বেসরকারী হাতে তুলে দিচ্ছে । তার বিভাগটাও চলে যেতে পারে । ত্রিপুরায় পেনশান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । আর চাকরিতে সে সংরক্ষন সেটাও কিন্ত সমাপ্ত হবার পথে ।

৭)   তৃনমূলে খাওয়া খাইয়ী নিয়ে গোষ্ঠি দ্বন্দ বড় প্রবল। এরা নিজেরা নিজেদের যত লোককে মেরেছে বিরোধীরা মারতে পারেনি। এই গোষ্ঠি দ্বন্দের কারনে গত ভোটে কিন্ত এক গোষ্ঠি আর গোষ্ঠিকে হারাবার জন্য বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে – বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল। এবার সেটা হবে না এমন কোন কথা নেই। এবার বিজেপির কাছে দেবার মত অনেক টাকা আছে।

৮)  সিপিএম এর যারা কট্টর সমর্থক যারা সিপিএম হেরে যাবার জন্য খুবই ব্যথিত। আহা কত না সুখের ছিল সে দিন! তোলাবাজি প্রোমোটারি সিণ্ডিকেট দারোগাগিরি। সব হারিয়ে তারা আজ মণিহারা ফনীর মত গর্জে বেড়াচ্ছে। এরা চায় যে কোন মুল্যে তৃনমুলকে হারাতে। যে কারনে গত ভোটে এরা জয় শ্রীরাম বলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। সেটা ছিল লোকসভা – ওতে তৃনমূল হারবে না — তারা জানতো। এবার আসল খেলা। ফলে তাদের ভোট অবশ্যই বিজেপিতে যাবে। 

তবে তখন তাদের এটা মনে রাখা চলবে না যে বিজেপির সবচেয়ে বড় শত্রু কিন্ত কমিউনিস্ট। যদি তার মধ্যে কমিউনিস্ট ভাবধারার কিছু মাত্র অবশিষ্ট থেকে যায় সে ক্ষেত্রে কিন্ত ভাগ্যে বিপদ আছে । মুসলমান — দলিত মারবে পরে, আগে কিন্ত কমনিস নিকেশ করে দেবে। আসামে কিন্ত কমরেড বললে — লাল সেলাম বললে ধরে খাঁচায় পুরে দিচ্ছে । 

৯)   আদিবাসী অঞ্চল গুলোয় তৃণমূল নেতাদের যে গরীবের প্রতি ব্যবহার — যে ভাবে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে ন্যায্য সরকারী প্রাপ্য থেকে, যে ভাবে কাটমানি খাওয়া হয়েছে — সেই রাগ উস্কে দিয়ে বিজেপি অনেক লাভবান হতে পেরেছে। এখনও তা জারি আছে । কাজেই আদিবাসীদের ভোট — সেটাও বিজেপির ভাগে যাবার কথা। 

তবে সেক্ষেত্রে আদিবাসী মানুষকে এটা মনে রাখা চলবে না যে – কর্পোরেট হাউসকে হাজার হাজার একর জমি দেবার জন্য, গোটা দেশে আদিবাসী মানুষদের কী ভাবে জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। ক্ষমতায় এসে গেলে এখানেও কিন্ত সেটা হতে পারে। তখন কিন্ত মনে হতে পারে যে গরম চাটু থেকে বাঁচতে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলাম।

১০) তৃণমূল দলের সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাঙ্ক মুসলমান ভোটার। এই ভোট ব্যাঙ্ক রক্ষা করতে গিয়ে যে ভাবে মমতা ব্যানার্জী যা করেছে – ভোট কতটা অটুট আছে তা সময় বলবে। কিন্ত মুসলমান তোষনের অজুহাতে অনেক নমো ভোটার যে সরে গেছে এটা সত্যি। যা এখন বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক। বিজেপি চেষ্টা করছে হায়দ্রাবাদে থেকে ‘মীম’ কে এখানে এনে মুসলমান এলাকায় প্রার্থী দাঁড় করাতে। যদি তারা সফল হয় আর যদি মীমের প্রার্থী মুসলমান ভোটের একটা অংশ কেটে বের করে নিতে পারে সে ক্ষেত্রে তৃণমূল প্রার্থী অবশ্যই হেরে যাবে। তাহলেই বিজেপির জয়ে আর কোন বাঁধা থাকবে না।

মীমের বাংলা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা থাকার কথা নয়। বিজেপি জিতলে এখানে বাঙালী — মুসলমান জীবন ধ্বস্ত হলে তার কী বা যায় আসে! সে যদি বিজেপির কাছ থেকে একটা ভালো রকম বকশিস পেয়ে যায় তার আর কী দরকার।

তবে সাধারন যে মুসলিম ভোটার — সে যদি এটা ভুলে যেতে পারে যে বিজেপি আমাদের পক্ষে হানীকারক নয়, তৃণমূল হেরে গেলে বা দুর্বল হলে আমাদের কিছু হবে না, তো তারা মীমকে ভোট দেবে। প্রকারান্তরে যা বিজেপির সহায়ক সিদ্ধ হবে । 

    ১১) সর্বশেষ যা বলার – তৃণমূল দলের অনেক নেতা যারা দলটার জন্মলগ্ন থেকে সঙ্গে আছে তারা কিন্ত অনেকে ভাইপোর রাজকীয় জীবন যাপনে, দাম্ভিক ব্যবহারে, বহু দুর্নীতির সঙ্গে নাম যুক্ত করে ফেলায় — আজ খুব ক্ষুব্ধ। তারা নিজেকে দলের মধ্যে উপেক্ষিত – অসম্মানীত মনে করছে। এদের অনেকের সঙ্গে কিন্ত বিজেপি যোগাযোগ রাখছে। এরা যদি ঠিক ভোটের মুখে দল ছেড়ে বের হয়ে গিয়ে বিজেপিতে যোগ দেয় — তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পোতা হয়ে যাবে। এই পয়েন্ট কটা ঠিকঠাক মিলে গেলে বঙ্গে অবশ্যই বিজেপি আসবে ।

1 Comments
  • avatar
    রত্না পাল

    30 August, 2020

    চোখে পড়ার মতো কিছু বানান ভুল আছে এটা কাম্য নয়।

Leave a reply