গণআন্দোলনের জাতীয় সমন্বয়: ন্যাশানাল অ্যালায়েন্স অফ পিপলস’ মুভমেন্ট (এনএপিএম)

  • 02 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 142 view(s)
  • লেখক: অনুবাদ : শুভদীপ সাহা

পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। যারা শ্রমিকদের জীবন ও যাপনের অধিকার নষ্ট করে সেই শোষণকারী, বর্বর পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।

আর ‘মৃত্যু’ নয়, আর ‘বিলম্ব’ নয়। আমরা এক্ষুনি, যত দ্রুত সম্ভব শ্রমিক চলাচলের ট্রেন-বাস চাই।

কিছু দিন আগে, ঔরঙ্গাবাদের কাছে এক মালবাহী ট্রেন ষোলোজন পরিযায়ী শ্রমিক, যাঁদের অধিকাংশই গোণ্ড আদিবাসী, তাঁদেরকে পিষে চলে যায়। যে পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো যেত। এই ঘটনায় ‘ন্যাশানাল অ্যালায়েন্স অফ পিপলস’ মুভমেন্ট (এনএপিএম) তাঁদের গভীর শোক প্রকাশ করে। এই পরিযায়ী শ্রমিকরা পায়ে হেঁটে, মধ্যপ্রদেশে তাঁদের বাড়ি ফিরছিলেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের এবং এরকম আরও মৃত্যু, যারা দিনের পর দিন, পথের পর পথ, হাঁটতে বাধ্য হচ্ছিলেন, তাঁদের মৃত্যুতে মোদী সরকারের চূড়ান্ত ব্যর্থতা এবং অপরাধমূলক ঔদাসীন্যই প্রকাশ পেয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন কর্পোরেট-বিল্ডার লবিগুলির স্বার্থে সহযোগী হয়ে অনেক রাজ্যই তাঁদের নিজ রাজ্যের শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে অনাগ্রহ প্রকাশ করে।

সারা দেশ দেখেছে, যে বিদেশ থেকে ‘দামী’ মানুষদের ফিরিয়ে আনতে সরকার যতটা তৎপরতা দেখিয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই ঔদাসীন্য দেখিয়েছে এই সরকার। যে পরিযায়ী শ্রমিকরা কোনোদিন সামান্য আর্থ-সামাজিক সুযোগ-সুবিধাটুকুও পাননি, তাঁদেরকে ব্রাত্য রেখেই এই পরিকল্পনাহীন ‘লকডাউন’ ডাকা হয়েছে, যেখানে তাঁদেরকে আরও বিপদের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ফলে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এবং শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে যেভাবে খুশি নিজ রাজ্যে ফিরতে বাধ্য হয়েছে … অধিকাংশই পায়ে হেঁটে।

যারা হাতে কলমে আমাদের দেশ গড়ে তুলছেন, সেই মানুষদের খবর যখন নানা সংবাদমাধ্যম তুলে ধরেছেন, তখন সমীক্ষায় দেখা গেছে, এখনও অবধি প্রায় ৩৫০ জনের বেশী মৃত্যু হয়েছে এই করোনার কারণের লকডাউনে এবং এঁদের মৃত্যুর কারণ করোনা নয়। যারা মারা গেছেন, বেশীরভাগই শ্রমজীবি মানুষ, কেউ অ্যাকসিডেন্টে, বিনা চিকিৎসায়, না খেতে পেয়ে, আর্থিক দুরবস্থায় এবং আত্মহত্যায়! ভারত সরকারকে এই প্রতিটি ‘হত্যার’ দায় নিতে হবে।

আরও অসভ্য/ অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি হয় যখন ভারত সরকার পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য ট্রেন চালু করেন এবং অবশ্যই অবশ্যই ‘চড়া দামের টিকিটে’। দেশের আপামর সাধারণ মানুষ এবং বিরোধীদের থেকে ধিক্কার পেয়ে অবশেষে সরকার ঘোষনা করতে বাধ্য হয় যে ‘টিকিটের ৮৫ শতাংশ ভাড়া সরকার বহন করবে’! অবশ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এই ঘোষনার দশ দিন (কি তারও বেশী) পরেও ‘শ্রমিক স্পেশাল ট্রেন’-এও শ্রমিকদের দুর্ভোগের অন্ত হয় না। যে আদেশনামা বের হয়েছিল সরকার থেকে সেটি এতটাই দ্ব্যর্থবোধক যে শ্রমিকদের নিজ নিজ রাজ্যে ফেরায় অতি সহজেই বাধার সম্মুখীন হতে হয়। আসরে নেমে মহামান্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানান যে যারা ‘লকডাউনের আগে’ যাত্রা শুরু করেছিলেন কেবলমাত্র তাঁরাই এই শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনে চড়ার অনুমতি পাবে। ফলত, পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরাটা সেই আতান্তরেই পড়ে যায়।  

পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা এবং তাঁদের গন্তব্যর তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা ভীষনই কম এবং শ্রমিকদের কাছে স্পষ্ট কোনো খবরও ছিল না ঠিক কোন ট্রেন বা কোন স্টেশনে কখন ছাড়বে। অনেকের কাছেই ভাড়া হিসেবে অত্যাধিক রকমের বেশী টাকা চাওয়া হয়। রাজ্য সরকারের মনোভাবও সহযোগীতা সম্পন্ন ছিল না। নানা শিল্পপতিরা যারা তাঁদের শ্রমিকদের অন্ন-বাসস্থান-সুরক্ষার ন্যূনতম দায়ভার নিচ্ছিলেন না, তাঁরাই নানা রাজ্যকে চাপ দিতে থাকেন যাতে তাঁরা শ্রমিকদের রাজ্যে ফেরত না নেয় এবং শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রেই থেকে যেতে পারে। কর্ণাটক সরকার জণগণের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়ে ‘ট্রেন থামাও’ নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলোও শিল্পপতিদের সাথে আলোচনায় ট্রেন আসা থামিয়ে দেয়। প্রতিবেশী রাজ্য বিহার, কেরালা থেকে আসা ট্রেনকে সবুজ সংকেত না দেওয়ায় বিহারী শ্রমিকরা নিজ রাজ্যে ফিরতে পারেননি।

পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার সমস্যা তীব্রতর হয়েছিল অপর্যাপ্ত ট্রেন এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুপযুক্ত প্রস্তুতি। স্পষ্টতই, নানা রাজ্য তাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে এইসব শ্রমিকদের ঘরে ফেরার অনুমতি দিচ্ছিলেন না। এতোদিন পরে, এখনও দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা শ্রমিকদের কাছে আকুল আকুতি জানাচ্ছেন যাতে তাঁরা থেকে যান এবং প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ‘তাঁদের যথোপযুক্ত দায়িত্ব নেওয়া হবে’।

কাজের রাজ্য থেকে বাড়ি ফেরার সময়ে অসংখ্য পরিযায়ী শ্রমিক তাঁদের যাত্রাপথে নানা রাজ্যের পুলিশের হাতে হেনস্থা হওয়ার খবর আমরা পেয়েছি। কেন্দ্র, কর্মক্ষেত্রের রাজ্য এবং নিজরাজ্যে (আবাসস্থল), তাঁদেরকে ‘বোঝা’ মনে করে একে অন্যের ওপর দায় চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে, কারোর ওপর ভরসা না করে শ্রমিকরা তাঁদের পরিবারের সাথে এই গরমের রাস্তায় পায়ে হেঁটে অথবা চড়া দামে ট্রাকে চেপে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। কিছু কিছু জায়গায় শ্রমিকরা এই অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দীদশার বিরুদ্ধে মুখর হয়েছেন। মনে রাখা প্রয়োজন, এই ‘লকডাউন’-এর মাধ্যমে, পরিযায়ী শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে।

এইসবের মধ্যেই, বিজেপি শাসিত রাজ্য যেমন উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশ, পরবর্তী তিনবছরের জন্য শ্রমিক আইনের বদলের সপক্ষে দাঁড়িয়েছে। অন্য অনেক রাজ্য, এমনকি কংগ্রেস শাসিত রাজস্থানও শ্রমিকদের কাজের সময় সর্বাধিক ৮ ঘন্টার বদলে ১২ ঘন্টা করার পক্ষে সওয়াল করেছে। এতে অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যেতে চলেছে। যারা এই দেশ গড়ে ওঠার কারিগর, সেই শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার আর অবমাননা করে কোনো অর্থনীতি ‘চাঙ্গা’ হতে পারে না!

এই অবস্থায়, যে সমস্ত শ্রমিকেরা ফিরতে চাইছে, তাঁদের জন্য আমরা আমাদের দাবী জানাচ্ছি।

১)     বিনামূল্যে শ্রমিকদের নিজরাজ্যে সুরক্ষিত ও সম্মানজনকভাবে ফেরত আনার অতি দ্রুত ব্যবস্থা করতে হবে। ফেরত আনার পরে নিকটবর্তী গ্রাম/ পঞ্চায়েত কোয়ারান্টাইন সেন্টার -এ প্রয়োজনীয় সমস্ত সুবিধা সহ তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।

২)    রাজ্যে/ জেলায় ঢোকার মুখগুলোতে এই কোয়ারান্টাইন সেন্টারগুলোতে ‘কোভিড-১৯’-এর নির্দেশিকা মেনে শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনীয় শারীরিক দূরত্ব, খাবার এবং পিপিই কিট-এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

৩)    যে সব কর্মচারী ও ডাক্তাররা এই শ্রমিকদের থেকে টাকা আদায় করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪)     কোয়ারান্টাইন সেন্টার থেকে নিজের বাড়ি ফেরত যাবার জন্য বিনামূল্যে পরিবহন ব্যবস্থার আয়োজন করতে হবে।

৫)    পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে ঢোকামাত্র তাঁদের জন্য ন্যূনতম ৫০০০/- টাকার আর্থিক সমর্থনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬)    বাস এবং ট্রেনের পূর্ণাঙ্গ সহজ সরল সময় তালিকা বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় স্থানে রাখতে হবে। ভিনরাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাত্রার সময় যাতে কোনোরকম অসুবিধে না হয় সেই ব্যাপারে সুনিশ্চিত করতে হবে।

৭)    শ্রমিকদের সাথে যাতে কোনো খারাপ ব্যবহার না হয়, মারধোর না হয় সেই ব্যাপারে পুলিশকে কড়া নির্দেশ দিতে হবে। রাজ্যে পৌঁছানো না অবধি তাঁদের প্রয়োজনীয় খাবারের বন্দোবস্ত করতে হবে।

৮)    খাবারের ব্যবস্থা এবং হাইওয়ে, রেলস্টেশনে তথ্যকেন্দ্রর ব্যবস্থা করতে হবে।

৯)    ‘পরিযায়ী শ্রমিকদের কর্ম পরিকল্পনা’ সরকারকে করতে হবে যেহেতু এই লকডাউনে অধিকাংশ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন, তাঁদের জীবিকা নির্ভরতা, সঞ্চয় হারিয়েছেন।

১০)   পিডিএস (পাবলিক ডিস্ট্রিবিউশান সিস্টেম)-এর মাধ্যমে পরবর্তী অন্তত ছ’মাসের জন্য সরকারকে শুকনো খাবারের ব্যবস্থা ও তার বিলির ব্যবস্থা করতে হবে। এই লকডাউন মধ্যবর্তী সময়ে শ্রমিকরা যাতে তাঁদের পূর্ণ বেতন পান তার দেখভালও সরকারকে করতে হবে।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

শ্রমিক ঐক্য জিন্দাবাদ!

মেধা পাটকর, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন (এনবিএ) ও অন্যান্যরা।

0 Comments
Leave a reply