দেবেশদাকে

  • 02 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 117 view(s)
  • লেখক: আয়েশা খাতুন

দেবেশ রায়, সাহিত্যিক দেবেশ রায় ক্রমশ নামটি খুব কাছাকাছি চলে আসে দেবেশদা। হ্যাঁ আমার প্রিয় লেখক প্রিয় মানুষ দেবেশদা। আজ আপনার বিদায়ক্ষণ আমাকে পৌচ্ছে দিলো ২০০৩ সালে। আমার চরিত্র নিয়ে আমার কাছে কোনো সংশয় ছিলো না। জানতাম আমি এটাই করবো। ক্লাস নাইনে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো পড়া এবং বিশ্লেষণ করার কাজে আমি কি করে যেন পটু হয়ে উঠেছিলাম। সেই চরিত্র কি করে যে বলাইকে খুঁজে নিয়েছিলাম নিজের ভিতরে। দেখলাম আমি একটা আস্ত বলাই হয়ে চেনা অচেনা জীবনে ঘুরে বেড়াচ্ছি। সেটাকেই মেনে নিয়েছিলাম। তাই ঘন ঘন জায়গা বদল পাড়াবদল আমার কাছে কোনো ভারি কাজ বলে মনে হয় নি। পালিয়ে যেতে নিজেকে লুকিয়ে নিতে, নিজেকে অচেনা কঠিন জাগায় হারিয়ে দিতে আমার খুব ভাল লাগে।

এই করতে শুরু করেছি। ১৯৯৮ সালে আমি কলকাতায় আসি বীরভূম থেকে। কিছুদিন আগেই আলাপ হয়ে ছিলো বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে, সেই সময় পূজো সংখ্যার জন্য একটা লেখা দিতে বললেন সপ্তাহ পত্রিকার সম্পাদক দিলীপ চক্রবর্তী মহাশয়। আমি ততক্ষণে একটা লেখা শেষ করেছি, একটা ছোট্ট উপন্যাস ‘শালুক ও সরুধানী’। একটু খানি পিছিয়ে যাচ্ছি, গল্প বলাতে পারদর্শী হলেও লেখাতে পারদর্শী ছিলাম না। আমার কলম পিছিয়ে যেতো। লেখায় থাকতো খাপছাড়া কথা, আমার মনে হতো আমি সে সব লিখে চলে এসেছি, কিন্তু না সেই আগের শব্দ ছেড়ে এসেছি যার জন্য মানে বদলে যেতো। যায় হোক বলবো তো দেবেশদা তোমার কথা। তোমার মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা। নিজের জীবনকে চাবকাতে কষ্ট না হলেও তোমার মতো প্রিয় জন চলে যাচ্ছে তাতে যে আমি ভিতরে ছিঁড়ে যাচ্ছি দেবেশদা। আবার বলছি আমি খুব অলস কলম ধরতে, কেনো যেন মনে হতো এসব ফালতু কথা কেনো লিখবো! একদিন দিলীপদা ধমকে বললেন যা লেখাটা নিয়ে আয়। আমি আমার সমস্ত লেখাগুলো থলেই ভরলাম, মানে ওই ছোট্ট উপন্যাসটা, আর অনেক পরিশ্রমের ফসল মুসলিম বিয়ের গানের সংগ্রহ। আমি তখনো আমার লেখার কোনো জেরক্স করে রাখতাম না। একাডেমি অফ ফাইনারটসে একটা প্রদর্শনীতে ইটালির এক শিল্পীকে কিছুটা সময় দিয়ে সাহায্য করবো বলেছিলাম। আবার বিকেলে সপ্তাহ অফিসে যাবার কথা দিলীপদাকে এই লেখাগুলো দেখাবার জন্য। আমি আমার ব্যাগটা প্রদর্শনী কঙ্কের এডমিনদের টেবিলে রেখে কাজে গেছি অন্য টেবিলে। ব্যাস ফিরে এসে দেখি সেই ব্যাগ আর নেই , চুরি করেছে। বাকী কথা বললাম না এখানে। খালি হাতে সপ্তাহ অফিসে গেলাম। মনমরা হয়ে বললাম দিলীপদা আমার লেখাগুলো ব্যাগ সমেত কে চুরি করে নিয়েছে  একথা শুনে দিলীপদা ক্ষেপে গিয়ে বললেন, আমি ওসব কিছু জানি না। দুদিন সময় দিলাম ওই লেখাটা লিখে তুই নিয়ে আসবি নচেত আসবি না। আমি বাড়ি ফিরে লিখতে বসলাম, তিন রাত আর দুই দিনে শালুক ও শুরুধানি লেখাটা শেষ করলাম। দিলীপদাকে দিয়ে এলাম। পত্রিকা বার হয়েছে আমি যায় নি নিতে। দিলীপদা ফোন করে ডাকলেন, গেলাম  সপ্তাহ অফিসে। যাওয়া মাত্র দিলীপদা একটা চিঠি ধরিয়ে বললেন, এই নে দেখ কে চিঠি লিখেছেন! তোকে লিখেছেন পড়।

আমি পড়ছি, প্রিয় সম্পাদক মহাশয় সপ্তাহ পূজো সংখ্যাটি পড়লাম, সালুক শুরুধানী উপন্যাসটি পড়ে আবিস্কার করলাম তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাতনী আয়েশা খাতুনকে। লেখিকার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস রইলো বাংলা সাহিত্যে আয়েশা খাতুন আর একটি তারা। তাঁর চিঠিটা এখন আছে আমার কলকাতার ঘরে আর মূল চিঠিটা আছে সপ্তাহ অফিসে। লকডাউন চলছে, গ্রামের গহিন মাটির কাছে বসে আছি দেবেশদা, যেতে পারছি না তোমার হাতের পাশে। আমি অমনি এক উদাসি মানুষ দিলীপদাকে চিঠিটা ফেরত দিয়ে বললাম ভালোই বলেছেন দেবেশদা লিখেছেন এই চিঠি! আমি দেখা করতে যাবো দেবেশদাকে! একদিন দেখা হয়ে গেলো তার সঙ্গে দারভাংগা হলে, তখন আমার ফিরে আই ফুল বউ বইটি বেরিয়েছে, আমি তার হাতে দিয়ে প্রণাম করে বললাম, দেবেশদা এই বইটি আমার, আপনি যদি হাতে নেন। তিনি বইটি হাতে নিয়ে বললেন, তোমার ফরিদার সাতকাহন পুরো পড়েছি এবং লিখেছি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির প্রত্রিকাতে দেখে নিও। আমি খুব লজ্জা পেলাম তার মতো সাহিত্যিক আমার লেখা নিয়ে লিখেছেন অথচ আমি জানি না। এটাকে আমার অসভ্যতা বলে মনে করলাম। আমি খুঁজতে লাগলাম কোথায় কোন সংখ্যায় আছে সে লেখা? কিন্তু স্বভাব অনুযায়ী আবার ভুলে গিয়ে কোথায় কতদুরে কাজে কাজে ঘুরে ফিরছি, এর মাঝে আবার একদিন দেখা বাংলা একাডেমীতে সেদিন ছিলো আমার গল্প পাঠ, আমার ভাঙন চরিত কথা উপন্যাসটি তার হাতে দিয়ে প্রণাম করে বললাম, দেবেশদা এটা আমার উপন্যাস আপনি যদি একটু হাতে নিন। তিনি হেসে বললেন, ও আয়েশা, তোমাকে তো খুঁজে পাই না। কোথায় হারিয়ে যাও! এখন কানে শুনি না বলে ফোন করতেও পারি না। আচ্ছা তুমি রোজাটা খুব ভালো লিখেছো, এগুলো লিখছো বলেই আর একটি অজানাকে জানতে পারছি। তুমি সুহাদকে ঠিক ভাবেই ধরেছো। দেবেশদা আমি আবার লজ্জা পেলাম। এরই মাঝে আমি ঢাকা গেলাম জাতীয় কবিতা উৎসবে কবিতা পড়তে। ঢাকার বাংলা একাডেমিতে গেলাম। অনেক সাহিত্যিক আছেন তাদের সঙ্গে দেখা করতে আর একটি বয়ের সন্ধানে। সেখানে দেখা হলো কবি তপন বাগচীর সঙ্গে, তিনি বললেন আপনার কথা জেনেছি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমির পত্রিকায় দেবেশ রায় আপনাকে নিয়ে লিখেছিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম আপনিকি আমাকে সেই পত্রিকাটি দিতে পারেন? তিনি কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই বের করে দিলেন। দেখলাম সেখানে ফিরিদার সাতকাহনের মাটির ফরিদা আর সাঁওতাল মেয়ে শুরুধানির কথা আছে আর ঝুরোবালির আওদারি চিতকারে জানতে পারা যায় শুরুধানির নামের ইতিহাস। মাঠের শুরুধান কাটতে গিয়ে সুগন্ধি মাঠেই তার মা ধান কাটতে কাটতে খালাস হয়ে ছিলো আর সাজু সেই মাঠ গিয়ে নাড়ি কেটের ছিলো। আর আজ শুরু ধানি গ্রাম, নদী পাহাড় ছেড়ে কোথায় কুন বাগে চলে যেচ্ছে তাকি এগেরাম সইতে পারে শুরুধানি! তিন বন্দোপাধ্যায়ের নাতনী বলে তুমি দেবেশদা আবার ডেকে গেছো। তোমার চলে যাওয়া তোমার এই অসময়ে অদিনে হাজার পরিয়ারী শ্রমিকের পায়ের তালে পা মেলাতে চলে যাওয়ায়। তুমি যে মানুষের কথা লিখে গেছো জানি না পরিয়ায়ী শ্রমিকের অক্ষম পায়ের শিথিল পেশি মাঝ পথে আপন দেশের মাটিকে চুমে পড়ে আছে কোথাও রেলের চাকায় রক্তদিয়ে ধুয়ে দিয়েছে ভারত গরিব নয় কোথাও রূটিতে পেন্টিক করে গেছে নিজের রক্ত দিয়ে হাত ধরাধরি অভিযান, এই অভিযানে তুমিও চলে গেলে আমি আজ তোমাকে বিদায় জানাতে পারিনা দেবেশদা। আমিও হাঁটছি এই অভিযানে। তোমার লম্বা ছায়া আল্পনার মতো ছুঁয়ে আছে আমাদের মাটিকে। তোমাক প্রনাম।

0 Comments
Leave a reply