কোভিড সংক্রমণ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়

  • 11 October, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 82 view(s)
  • লেখক: রজত দাশগুপ্ত

মহামারীতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কতটা ব্যাহত হয়েছে তার একটি পরিমাপক হিসেবে দেশের জিডিপিকেই সাধারণত মাপকাঠি করানথয়। কিন্তু জিডিপির পরিমাপন একটি সংখ্যামাত্র নির্দেশ করে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, সাধারণ শ্রমিকদের অবস্থা নিরীক্ষণের কাজে এর ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতা কোথায়, তা একটু অনুসন্ধান করে দেখা যেতেই পারে।

মহামারীতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড কতটা ব্যাহত হয়েছে তার একটি পরিমাপক হিসেবে দেশের  জিডিপিকেই সাধারণত মাপকাঠি করানথয়। কিন্তু জিডিপির পরিমাপন একটি সংখ্যামাত্র নির্দেশ করে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, সাধারণ শ্রমিকদের অবস্থা নিরীক্ষণের কাজে এর ব্যবহারিক প্রাসঙ্গিকতা কোথায়, তা একটু অনুসন্ধান করে দেখা যেতেই পারে।  

জাতীয় নমুনা সমীক্ষা দপ্তরের (এনএসএসও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেল যে, ২০১৯ এর এপ্রিল থেকে জুন এই সময়ের তুলনায় ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুনে জিডিপি ২৩.৯ শতাংশ কমেছে অর্থাৎ সংক্রমণের ধাক্কায় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড গতবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক চতুর্থাংশ হ্রাস পেয়েছে। আমার আপনার কাছে  এই তথ্য কী অর্থ বহন করে তা বোঝার আগে বলতে হয় এই সঙ্কোচন অপ্রত্যাশিত ছিল না। সার্বিক লক ডাউন যেখানেই হয়েছে সেইসব দেশেই জিডিপি অধোগামী - যদিও মাত্রার অনেক হেরফের আছে। আমরা লক্ষ্য করেছি জি-২০ গোষ্ঠীর দেশগুলির মধ্যে ভারতের জিডিপিতে উপরোক্ত সঙ্কোচন সর্বাধিক। কিন্তু এটাই সব নয়। ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের প্রথম থেকেই এদেশে অর্থনীতির গতি মন্থর হতে শুরু করে । ২০১৯-২০ অর্থবর্ষের প্রতিটি ত্রৈমাসিকেই বৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসমান ছিল - সঙ্গে ছিল লগ্নি ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদার ঘাটতি আর ক্রমশঃ বেড়ে চলা বেকারত্ব। স্বভাবত: এই মন্থরতার জের পরবর্তী সময়েও জারী ছিল। তাই সরকারী ভাষ্যের ‘ভগবানের মার’, যা আসলে কোভিড সংক্রমণ, অর্থনীতির মুখ থুবড়ে পড়ার একমাত্র কারণ হতে পারে না। সর্বব্যাপী না হলেও, প্রকৃতপক্ষে অর্থনৈতিক মন্দার সূত্রপাত ২০১৮-১৯ থেকেই। অবিরত সরকারী স্লোগান ও প্রচারের ঢক্কানিনাদে অথবা ব্যাঙ্ক ঋণে সুদের হার বারংবার কমানো সত্ত্বেও বিনিয়োগে জোয়ার আসেনি। কিন্তু পোক্ত হয়েছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ ভিত্তি। মুষ্টিমেয় কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, সামাজিক-মাধ্যম, খুচরো-বণিজ্য, বেসরকারী পেট্রোলিয়াম-জাত শিল্প, বড়ো ও ছোট শহরের বিমানবন্দর, মেট্রো শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিকাঠামো-শিল্প - সবেতেই একের পর এক অধিগ্রহণ করছেন অথবা মালিকানার অংশীদার হয়ে উঠছেন।

জিডিপি সঙ্কোচনের ফলে দেশের অর্থনীতিতে একধরণের দুষ্ট-চক্রের সৃষ্টি হয়েছে। উৎপাদন কমছে তাই নাগরিকদের আয়ও অধোমুখী (সঙ্গে সরকারের আয়ও কারণ ট্যাক্স আদায়েও ঘাটতি ক্রমবর্ধমান)। ফলে ভোগ্যপণ্যের চাহিদাও ক্রমহ্রাসমান। এর ফলে শিল্পোৎপাদন থেকে আয় এবং শিল্পক্ষেত্রে কাজের সুযোগ দুই-ই কমছে। এই সার্বিক অধোগতি হয়ত দীর্ঘস্থায়ী হবেনা কিন্তু বহু শ্রমিককে দীর্ঘস্থায়ী দুর্দশায় রাখবে কারণ সরকারী উদ্যোগে আমজনতার জন্য নির্ধারিত ও বহুল প্রচারিত আর্থিক প্রণোদনার ‘জুমলা’ তার স্বরূপ প্রকাশ করে ফেলেছে।

এবার আসা যাক কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে। লকডাউনের ফলে যে সমস্ত শিল্পক্ষেত্রের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলি হল নির্মাণশিল্প, পরিবহনশিল্প, ভ্রমণ ও হোটেল ব্যবসা, কারখানা ভিত্তিক উৎপাদন ইত্যাদি। সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব হল ভয়াবহ, কারণ বেসরকারী ক্ষেত্রে এই শিল্পগুলিতেই দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহ হয়। এর মধ্যে নির্মাণশিল্পে আঘাত আসে সবচেয়ে বেশি। এখানে উৎপাদনের সঙ্কোচন হয় শতকরা পঞ্চাশ ভাগ যেখান অপরিকল্পিত লকডাউনই ছিল মূল কারণ।  এছাড়া আরও কিছু কাঠামোগত কারণও আছে। প্রথমত: এই শিল্পে প্রধান বিনিয়োগকারী কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির দূরদর্শিতার চিরকালীন অভাব আছে। যেকোনো রাজ্য সরকারের অর্থাভাব ঘটলে সর্বাগ্রে শ্রমিক ছাঁটাই হয় নির্মাণশিল্পে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার এই জমানায় অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বুলেট ট্রেণ আর নতুন পার্লামেন্ট ভবনের মত অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে। দ্বিতীয়ত: মহামারীর কারণে নির্মানশিল্পের মুখ্য ভরসা যারা, সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলির ছিল পরিকল্পনার অভাব এবং বহুক্ষেত্রে চরম ঔদাসীন্য। একটি বৃহৎ শ্রমিকগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা নিয়ে ছেলেখেলা করার জন্য সরকারের অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিকরা না পেলেন বিচারবিভাগের সহানুভূতি না পেলেন জনসাধারণের দীর্ঘমেয়াদী সমর্থন!  

এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পিত শ্রম আইনের যে পরিবর্তনগুলি খসড়া অবস্থায় রয়েছে,  তারও উল্লেখ করা যেতে পারে। এই প্রস্তাবিত পরিবর্তিত কাঠামোর মূল প্রস্তাবগুলি হল - কাজের  সময় বাড়িয়ে দেওয়া, সমস্ত ধরণের কাজে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা করা, মজুরি স্থির করার ব্যাপারে মালিককে অধিকতর স্বাধীনতা দেওয়া ইত্যাদি। এখন দেখতে হবে ট্রেড ইউনিয়নগুলি কতদিন এই উদ্যোগের বিরোধিতা জারী রাখতে পারে। যদি তারা এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায় তবে অনেক আয়াসে অর্জিত শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার বিলুপ্ত হবে।

শেষে যে  বিষয়টি উল্লেখ করা হবে তা প্রধানত অর্থনৈতিক হলেও, এই ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার যে অবস্থান নিয়েছেন তার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী হবে। জিএসটি ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক এই কেন্দ্র বনাম রাজ্য বিতর্কটি  প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। ২০১৭ সালে লাগু হওয়া জিএসটির কাঠামোর  মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল, যে যে রাজ্যগুলিতে GST বাবদ আদায়ের বৃদ্ধি পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে  ১৪% এর কম  হবে সেই রাজ্যগুলিকে কেন্দ্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে রাজ্যের ঘাটতি মেটাবে। এই ব্যবস্থা চলবে ২০২২ পর্যন্ত। এই ঘাটতি মেটানোর জন্য কেন্দ্র একটি জিএসটি ক্ষতিপূরণ তহবিল তৈরী করে ও ‘জিএসটি ক্ষতিপূরণ শুল্ক’ আদায় শুরু করে। এই উৎস থেকে কেন্দ্র ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ৪১ কোটি  আর ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ৬৯ কোটি টাকা রাজ্যগুলিকে দিয়েছিল। এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এইজন্য যে জিএসটি চালু হওয়ার পর যখন পূর্ববর্তী ট্যাক্স কাঠামো সম্পূর্ণ বাতিল হয় তখন শিল্পোৎপাদনে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলি আয়ের ঘাটতির সম্মুখীন হয় কারণ জিএসটি কেবলমাত্র কোনো দ্রব্যের গন্তব্য রাজ্যেই আদায় হয় উৎপাদক রাজ্যে নয়।

কোভিড সংক্রমণের সময়ে সব রাজ্যেই জিএসটি আদায়ে বিপুল ঘাটতি হয়েছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতে প্রবল ব্যয়বৃদ্ধি হয়েছে। বহু রাজ্যই কেন্দ্রের দ্বারস্থ হয়েছে ক্ষতিপূরণের জন্য। কেন্দ্র অক্ষমতা জানিয়েছে কারণ ক্ষতিপূরণ তহবিলে অর্থ আর অবশিষ্ট নেই।  এছাড়া কেন্দ্র আরও জানিয়েছে যে ঋণসংগ্রহ করে রাজ্যকে এই ক্ষতিপূরণ দেবার কোনো আইনগত দায় কেন্দ্রের নেই। পক্ষান্তরে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মাধ্যমে বাজার থেকে ঋণসংগ্রহের উপদেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থদপ্তর। রাজ্যগুলি কেন্দ্রের এই অবস্থানকে যুগপৎ রাজনৈতিক চাল ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত বলে মনে করছে। এছাড়াও আছে ঋণ বাবদ অতিরক্ত সুদের চাপ। অন্ততঃ সাতটি রাজ্য এ বিষয়ে জোড়ালো প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেন্দ্র অনড়।

0 Comments
Leave a reply