ঈশান কোনে দু হাতে কে?

  • 02 August, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 113 view(s)
  • লেখক: পার্থসারথি বসু

ভুল রাজনীতির মানচিত্রে আসাম, কিন্তু বাঙালির পরম্পরা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মানচিত্রে ঈশান বাংলা, বরাকবঙ্গের শিলচরে ১৯৬১-র ১৯শে মে, আজকের দিনে, বাংলা ভাষার অধিকারের প্রশ্নে, বাঙালি পরিচয়ে বাঁচার প্রশ্নে, প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মশাল জ্বেলেছিলেন একদল ভূমিপুত্র তবু নিজভূমে পরবাসী বাঙালি। ১৮৭৪-য়ে বৃটিশ শাসকের বদান্যতায় পূর্বদেশ তথা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সী ভেঙে, রংপুর আর ময়মনসিংহ খান খান করে গোয়ালপাড়া ধুবড়ি দরং সমেত যে বিশাল ভূখণ্ড সহ আসাম নামের শল্যপ্রসূত শিশুটি জন্ম নিল তার গোড়ার গলদ ওই আসাম নামটিই। ভূমিপুত্র বাঙালিরা অশনি সংকেত পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা ভরসা রেখেছিলেন যে কলকাতাইয়া নবজাগরণের বাবুগণে তেনাদের এই ঈশান বাংলা নিয়ে তেমন হেলদোল ছিল না।

তা ছাড়া বৃটিশ বুঝিয়েছিল বাঙালির অধিকার আবহমান কালের মতোই এই নবগঠিত প্রদেশেও সুরক্ষিত থাকবে। কি শিক্ষায়। কি আইনি শাসনে। বাঙালি এই নতুন প্রদেশেও থাকবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর কলকাতা হাইকোর্টের ছত্রছায়ায়। আমি সংক্ষেপে বলতে গিয়ে সরলীকরণের ফাঁদে পা দেব না। আগ্রহীরা চাইলে তখনকার প্রাসঙ্গিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখতে পারেন।

উপরন্তু নামে আসাম বলেই সেই মুহূর্তে বাঙালি সমেত নানা অসমীয়া জন বা জাতিগোষ্ঠীও এক ধরণের সাময়িক আত্মপ্রসাদ পেয়েছিলেন হয়তো। সংখ্যালঘু অসমীয়া সংখ্যার কারণেই মাথায় চাপতে অক্ষম। ফলত যার যার জাতিসত্তার মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চেপে রেখেই তারা নতুন প্রদেশে নিজেদের ততোটা বিপন্ন বোধ করেন নি। কালক্রমে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি এর বিষফল। শিলংকে রাজধানী করে সাত বোনের যে যৌথ সংসারে আসামকে কর্তা বানিয়েছিল বৃটিশ ‘ফাল কর আর শাসন কর’র কূটনীতিতে তাতে উগ্র অসমীয়া জাতিবাদ কালে কালে হিংস্র দানবের পুষ্টি পায় যার ফলশ্রুতি খান খান আসাম। নাগাল্যাণ্ড থেকে মেঘালয়, অরুণাচল থেকে মিজোরাম যে যার মাটি বুঝে নিয়েছে। অথচ অসমীয়া উগ্র জাতিবাদ সন্ত্রাসের সলতে পাকিয়েছিল এই কাছাড়েই। ভাষার প্রশ্ন সামনে রেখে। আসামের ভাষা, রাজভাষা হবে অসমীয়া। আসাম অসমীয়াদের। বাকিরা বিদেশী। আসামে থাকতে হলে অসমীয়া পরিচয়ে থাকতে হবে।

আপাত দৃষ্টিতে দাবিটি অন্যায্য নয়। সাম্প্রতিক কালেই ভারতের নানা ভাষার ভিত্তিতে গঠিত রাজ্য রাজ্যের ভাষা শিক্ষায় ও পেশাগত কাজে আবশ্যিক করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ব্যতিক্রম। তাই নিয়ে আমরা বাঙালিরাও সন্তুষ্ট নই। তাহলে আসাম কি দোষ করেছিল?

উনিশে মে নিয়ে বলতে গিয়ে শুরুতেই যে শিবের গাজন এতো ক্ষণ গাইলাম তাতে ব্যাপারটি স্পষ্ট করার প্রয়াস পেয়েছি। আর একবার চোখ বোলান। আসাম তো ভাষার ভিত্তিতে গঠিত রাজ্যই নয়। অসমীয়ারা পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা বাঙালির ভূমি ও ভাষা গ্রাস করতে শুরু করেছিল ‘বঙ্গাল খেদা’। উজান আসামে। শিলচরে থমকে গেছিল বিজয়রথ। আপামর বাঙালির ক্রুদ্ধ প্রতিরোধে। তো বুলেটের শাসন। বাঙালিরা মিছিলে সামিল হয়েছেন। সত্যাগ্রহ করেছেন। কিন্ত হিংসায় নামেন নি। নামার প্রত্যক্ষ কারণও ছিল না। শিলচর, হাইলাকান্দি করিমগঞ্জ ছিল বাস্তবেই অসমীয়াশূন্য। প্রশাসনের উপরতলার লোকজন ব্যতীত। ঘটনার দিনে অহিংস রেল অবরোধ ছিল। সারাদিন শান্তিতে কেটেছে। সত্যাগ্রহীদের মধ্যে রেল লাইনে বসেছিল বয়সে সবার ছোট যে নাবালিকা মেয়েটি তার বয়স তখন মাত্রই ষোল।

সকালে জলখাবারও খাওয়া হয় নি। বলা ভালো নুন আনতে পান্তা ফুরোয় গরীবের ঘরে মুড়িও বাড়ন্ত। মাকে বলে গেছিল সত্যাগ্রহ মিটলেই বাড়ি ফিরেই যা জুটবে খাবে। এগারো ভাষা শহিদের মধ্যে কমলাই কেবল স্কুলের ছাত্রী। বড় কষ্ট করে পড়াশুনা অসম্ভব মনের জোরে চালিয়ে গেছে। নোটবই দূরের কথা। বই চেয়ে চিন্তে। খাতা পুরনো বাতিল ক্যালেন্ডারের পাতা। স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে। ক’দিন বাদেই ফল বেরুবে। কমলার বাড়ি ফেরাই হলো না। সত্যাগ্রহের শেষ লগ্নে বিনা প্ররোচনায় গুলি চালালো আসাম পুলিশ। কমলার মাথা এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেল। লুটিয়ে পড়ল তার দশ সহযোদ্ধা ভাই। তারা পেশা পরিচয়ে কেউ চাকুরে, কেউ ছুতার, কেউ পাইকারের গদিতে খাতা লেখে, কেউ কাগজের ঠোঙা বিক্রেতা। এর দেখেই বোঝা যায় শিলচর ভাষা আন্দোলনের জনভিত্তি কতোটা গভীর ছিল। কতোটা মজবুত।

এখানেই পাঠক সংগতভাবেই তর্কে নামতে পারেন, তাই যদি হয়, তবে শিলচর এতো শহিদের রক্তে নিদেন বাঙালির জন্য আর একটি রাজ্য হাসিল করতে পারল না কেন?

যখন কিনা সদ্যোজাত ভুল পাকিস্তানে ঢাকার ছাত্রদের আত্মবলিদান কালক্রমে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিল? এই প্রশ্ন শিলচরে থাকাকালীন শক্তিপদ ব্রহ্মচারী, বিজিৎ ভট্টাচার্য, ব্রজেন্দ্রনাথ সিংহ — জনে জনে করেছি। শিলচরের বাঙালি, যা বুঝেছিলাম এবং যেটাই সব নয় পরে বুঝেছি, উজান আসামের বাঙালির স্বার্থে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন নিজেদের। আরও এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। অবশ্য আজকের প্রজন্মের এক প্রতিনিধি করিমগঞ্জের শুভদীপ দত্ত আক্ষেপ করলেন — ঢাকা রাজধানী শহর বলেই আবিশ্ব গুরুত্ব পেয়েছিল। শিলচর ছোট শহর। প্রান্তিক শহর। তাই সেভাবে নজর কাড়ে নি।

নজর কেড়েছে বই কি! মশালটি ধিকি ধিকি হলেও অন্তত সম্বছরের শহিদস্মরণে জ্বলেছে। আমার শিলচর অফিসের সহকর্মীরা যদিও বেসুরোও গাইতেন কেউ কেউ। ভাষা শহিদের মাটিতে বাংলা মাধ্যমের স্কুল হেরে যাচ্ছে ইংরাজি স্কুল গুলোর কাছে! ছুঁচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বার হচ্ছে হিন্দিও। তা ছুঁচটি ঢুকিয়েছিলেন কে?

বলছি। তার আগে শিলচর ভাষা আন্দোলনের সীমিত অর্জন যাও আজ বার বার আবারও হুমকির মুখে তার দুর্বলতার দিকগুলি খতিয়ে দেখি। চল্লিশের দশক থেকেই বাঙালি দ্বিজাতি তত্ত্বের বিষক্রিয়ায় হিন্দুমুসলমানে বিভাজিত। সাতচল্লিশে বখরা হচ্ছে বাঙালির স্বার্থে নয়, হিন্দুমুসলমানে, মৌলবাদের বা বলা ভালো ধর্মান্ধদের ইশারায়। মুসলমানপ্রধান গোয়ালপাড়া দরং বাংলায় থাকলো কি না থাকলো তা নিয়ে কলকাতার নবজগরনীয়াদের মাথাব্যথা ছিল না।

যে ভাবে সিলেটের বখরাও দেশভাগের পর নির্ণীত হয়েছে দ্বিজাতিতত্বের তুলায়, তবে হিন্দুত্বের বাটখারায় পাষাণ ছিল। অসমীয়া জাতিবৈরিতা বাঙালিপ্রধান সিলেট হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে পাকিস্তানে গিয়ে পাপ বিদেয় হোক এটাই চেয়েছিল। চাবাগানের শ্রমিকদের ভোটাধিকার না দিয়ে ও আরও নানা কৌশলে অসমীয়ারা যা শত্তুর পরে পরে করতে চেয়েছিল। তবু সিলেটের তিনটে থানা যে আসামে রয়ে গেল এটা সেইসময়ে অসমীয়াদের গাত্রদাহ।

১৮৭৪য়ের বাংলাভাগ কবিগুরু পরবর্তীকালে বর্ণনা করেছেন মমতাবিহীন কালস্রোত নামে। কবিগুরু বাংলা সমেত উপড়ে আনা সিলেটের বাঙালি যারা আসাম নামের টবের গাছ, তাদের সাথে সাক্ষাতে এক অনুরাগীর খাতায় লিখে দিয়েছিলেন মমতাবিহীন কালস্রোতে বাঙ্গালার রাষ্ট্রসীমা হতে নির্বাসিতা তুমি সুন্দরী শ্রীভূমি!

এখানে লক্ষ্যনীয় কবিগুরু বাঙ্গালার রাষ্ট্রসীমা বললেন। ভারত রাষ্ট্র দেশভাগের পর একটি আগ্রাসী নির্মান। এবং এই নির্মানে বাঙালিকে আরও আরও কোণঠাসা করা হয়েছে। বাংলার বৃহদংশ পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট বাংলা তার হৃত ভূমি উদ্ধারের ডাক দেয় নি। বরং বাংলা বিহার একাকার করার চক্রান্ত করেছেন বিধান বাবুর মতো তথাকথিত বাংলার রূপকার গণ। আসামের, বলা ভালো বরাক বঙ্গের, একষট্টির ভাষা আন্দোলন বিধানবাবুদের সেভাবে পাশে পায় নি সেদিন। আর প্রায় নয় দশকের ব্যবধানে শিলচরের বাঙালিকে কলকাতা ভাই বলে ডাকতেই ভুলে গেছে।

অথচ শিলচরের ভাষা আন্দোলন তার সীমিত অর্জন সত্ত্বেও আমাদের কিছু প্রণিধানযোগ্য পাঠ দিয়েছিল যাতে আমরা মনোযোগ দিই নি। তখনকার আসাম এক মিনি ভারত। বহু ভাষা ও বহু জাতির দেশ। একটি বিশেষ ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, এই ক্ষেত্রে অসমীয়া, সমস্ত অনসমীয়া ভাষাভাষীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন। ছিলেন নেপালি, ডিমাসা, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি মায় স্থানীয় মারওয়াড়িরাও। মারওয়াড়িদের অবশ্য রং গিরগিটির মতো বদলেছে উজানি আসামে। এদের মাতৃভাষা মারওয়াড়ি বা রাজস্থানি। কিন্তু এরা পরিযায়ী ব্যবসায়ী হওয়ার সুবাদে দেশান্তরে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে অভ্যস্ত ছিলই। আসামের রবীন্দ্রনাথ যাকে বলা হয় তার নাম জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়াল। এই ট্র্যাডিশন সমানে চলে এসেছে যদ্যপি না মোদীর উত্থানের সঙ্গে হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের পাঁয়তারায় তারাও নাফা দেখছেন। তারাও আজ হিন্দিবাদী। হিন্দুবাদী। হিটলারবাদী। শিলচরের বাংলা ভাষার আন্দোলনে অনসমীয়া ভাষা গোষ্ঠীর সবাই নিজ নিজ মাতৃভাষার উপর সম্ভাব্য বিপদটিকে আঁচ করতে পেরেছিলেন। এই অধিকার সচেতনতায় বরাকবঙ্গের আর একটি সমৃদ্ধ ভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী অস্তিত্বের সংগ্রাম জারি রাখে। ১৯৯৬ সালের মার্চে এই শিলচরের মাটিতেই শহিদ হন সুদেষ্ণা সিংহ। একষট্টির মে তাই মাতৃভাষা আন্দোলনেরও আঁতুড়ঘর।

শিলচরের ভাষা আন্দোলনের যে দূর্বলতাগুলি তা প্রকাশ্যে আলোচনা হোক। আসুন, কার্পেটের নীচের ধুলো ঝাড়ি। আন্দোলন যখন পরিণতি পাচ্ছে লাগলো, লাগানো হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। চরের বাঙালি, গোয়ালপাড়ার বাঙালি, দরং আর ধুবড়ির বাঙালি, হোজাইয়ের বাঙালি যারা ধর্মে মুসলমান বন্দুকের মুখে বাধ্য হলেন অনসমীয়া পরিচয় মেনে নিছক প্রাণে বাঁচতে। হাজার হাজার বছর যে দুটি সম্প্রদায় পাশাপাশি সুখে দুঃখেই বাস করে এসেছে অবাঙালি প্রযোজিত, হিন্দুত্ববাদীদের প্রযোজিত ছেচল্লিশের কলকাতা দাঙ্গা আর পিঠোপিঠি নোয়াখালির রায়ট, বাঙালি মানসে যে গভীর ক্ষত তৈরি করে দিল তার সুযোগ নিল হিন্দিবলয়। বাঙালি মূলগত ভাবে সম্প্রীতি প্রবন এই আত্মতৃপ্তি যারা পোষণ করেন মুখ দেখুন আয়নায়। দেশভাগ বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলমানকে যেভাবে পরস্পরের শত্রু করে দিল, যে মানসিক অসূয়ার শিকার হলো দুই সম্প্রদায় তার জের টেনে টলিউড তার দীর্ঘ গোরবের ছায়াছবি শিল্পে একটিও বাঙালি মুসলমান নায়ক আমাদের সামনে পেশ করতে পারে নি আজ অবধি। টলিগঞ্জের রাজ্জাক ওপার বাংলার সুপার হিট নায়ক রাজ্জাক। অথচ যে হিন্দিবলয় আখলাককে মারে তারা বলিউডি সিনেমায় মুসলমান নায়ককে দেখে ফিদা হয়। আমি বলতে চাই বাঙালি মানুষ ও বাঙালি মানস এখনো সেই কলুষ মুক্ত নয়। শিলচরে দুই বাঙালি সম্প্রদায় পরস্পরকে সেভাবে বিশ্বাস করতে পারে নি। ভাষা আন্দোলন স্থানিকভাবে বাংলা ভাষার অধিকার আদায় করতে পারলেও তা জাতিসত্তার আকাঙ্ক্ষায় পুষ্টি পায় নি। নতুবা নিদেন পক্ষে কাছাড় ত্রিপুরা মিলিয়েও বাঙালির আর একটি রাজ্য হাসিল করা যেতো। 

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর ভূমিকা শিলচর ভাষা আন্দোলনে কি ছিল? তিনি মধ্যস্থ করতে এসে এই ভূবনে হিন্দির অভিষেক ঘটিয়ে গিয়েছিলেন। পূর্বদেশে হিন্দি আগ্রাসনের তিনিই হোতা পুরুষ। ব্যক্তিগত সততায় প্রশ্ন তুলছি না। সংবিধানে হিন্দিকে যখন রাষ্ট্রভাষা বা জাতীয় ভাষার তকমা দেওয়া গেল না, হিন্দিকে করা হলো দপ্তরি ভাষা যা লেখা হবে দেবনাগরি লিপিতে। একে তো নাগরী লিপিকে দেব সম্বোধনের ভড়ং, তদুপরি হিন্দি যেই কয়েক শত ভারতীয় ভাষাকে সরকারি মদতে গ্রাস করলো উপভাষার তকমায় তখনই লিপির রাজনীতিতে হিন্দি আগ্রাসনকে মোলায়েম ভাবে পেশ করার মতলব শানায় হিন্দুত্ববাদীরা। বাংলা লিপি বিকাশ কাল থেকেই পূর্ব দেশের নানা ভাষাকে লালন করেছে। অসমীয়া, বোড়ো, ডিমাসা, ককবরক, মণিপুরী, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, সাঁওতালি, মুণ্ডারি নানা ভাষাই এই গৌড়ীয় লিপিতে ভর করেছে। এই লিপি এই ভূখণ্ডের নানা জাতি ও ভাষা গোষ্ঠীগুলিকে পরস্পরে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। হিন্দি এই পরিসরে ঢুকে গত সত্তর বছরে প্রতাপশালী হয়েছে। আসামের বিজেপি শাসনে অসমীয়ারা এমনকি তাদের ভাষিক অর্জনগুলিও হারাতে বসেছে। ত্রিপুরা তথৈবচ।

রচনাটি দীর্ঘ হয়ে গেল। আমি অকপটে আমার সাধ্যমতো যা বুঝেছি বললাম। শেষকথা যা বলার বাঙালি জাতীয়তা আর বাঙালি সভ্যতা সর্বসম নয়। বাঙালি জাতীয়তা ভাষাভিত্তিক। কিন্তু বাঙালি সভ্যতার পরিসরে এই ভূখণ্ডের আবহমানের বাংলা লিপি আশ্রিত সমস্ত জনজাতিও সামিল। লিপির রাজনীতি, দেবনাগরী লিপির রাজনীতি এই সভ্যতাকে বিপন্ন করেছে যেখানে বাঙালির নেতৃত্ব ছিল দীর্ঘদিন অবিসংবাদিত। যতোদিন না বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়ন এবং মেকলীয় শিক্ষা বাঙালিকে স্বাভাবিক নেতৃত্বের অবস্থান থেকে ছিটকে দিল। বাঙালি বিদ্বেষ একটি চর্চার বিষয় হয়ে উঠল।

এনআরসি নিয়ে কি হলো আমরা জানি। কি হতে যাচ্ছে তা অনুমানসাপেক্ষ। করোনার সুযোগে দিল্লি দেশী বিদেশী পুঁজির কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক হারাচ্ছেন তার দীর্ঘদিনের অর্জিত অধিকার।

ঈশান কোনে শিলচর যে মশাল জ্বেলেছিল, আসুন, সেই আগুনে আবার মশাল জ্বালি। ইতিহাস গড়বে পূর্বদেশ। ইতিহাস গড়বে জনগণ।

0 Comments
Leave a reply