কেন বাংলার মুখ?

 বাংলার মুখের যাত্রা শুরু নব্বইএর দশকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আশ্লেষে,  বাংলাদেশের প্রতি এক রোমাঞ্চকর  মমতায়,জাতিসত্তার একাত্মতায় ।   গোর্খা, সাঁওতালসহ ভিন্ন জাতিসত্তা গুলির প্রতি সহমর্মিতায় ।অন্যায় দেশভাগের বিরুদ্ধে  এক মুক দ্রোহে । জাতিসত্তার  নিম্নবর্গের দলিত, মুসলমান এবং আদিবাসীদের  প্রতি সম অধিকারের দৃষ্টিতে।  এক কথায়,ব্রাহ্মণ্যবাদ ও কর্পোরেট পুঁজির  আন্তর্জাতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে। শুরুতে খুব স্বাভাবিকভাবেই তরুণ কবিদের হাত ধরেই ভাষা সংস্কৃতির আবেগ ধ্বনিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা নিয়েও আমরা ভাষা দিবস পালন করেছি।  পত্রিকায় তার প্রতিফলন দেখেছি। সম্প্রীতির আহ্বানে পালিত হয়েছে সমস্ত ধর্মীয় বাঙালির সাধারন উৎসব, নববর্ষ।দেশভাগের ইতিহাস আমরা চর্চার মধ্যে নিয়ে এসেছি ।অনেকটা  স্বপ্নের মত বাংলার কম্যুনিস্ট  আন্দোলনে যেমন জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছি,তেমনি সাম্প্রদায়িকতার  বিরুদ্ধে জাতপাতের অবসানের কথা বলেছি। আম্বেদকর, জ্যোতিবা ফুলে, পেরিয়ার, যোগেন মণ্ডলের  চিন্তাভাবনার অনুশীলন শুরু করেছি। কালক্রমে যখন গিরগিটির মতন হিন্দুত্ব ফ্যাসিবাদের অপ্রতিহত উত্থান শুরু   হয়েছে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হবার পর, তখন আমরা লক্ষ্য করেছি ভারতের ধংসপ্রায় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ।

   হিংস্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থানের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করেছি কর্পোরেট হাঙরদের জল,জমি ও  জঙ্গল লুণ্ঠন।বিচার ব্যবস্থার শাসক দলীয় করণ। মিডিয়া কে প্রলোভন, ভয় ও সন্ত্রাস করে দখল করার প্রক্রিয়া চলেছে। সংবিধানের নিয়ম কানুনের কোন তোয়াক্কা নেই ।দেদার সাংসদ ও বিধায়ক কেনা বেচা হচ্ছে। রেল,খনি,  লাভজনক সরকারি সংস্থা বেঁচে দেয়া হচ্ছে।অরণ্য থেকে আদিবাসীদের উৎখাত করার ব্যবস্থা পাকা হচ্ছে।এক বছর আগে ৫ আগস্ট কাশ্মীরকে দুটুকরো করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষণা করা হল ৩৭০ ধারা তুলে দিয়ে। স্থানীয় মানুষের মতামতের তোয়াক্কা না করে ।নেট বন্ধ, বিরোধী নেতারা জেলবন্দ্‌অগুন্তি সেনা টহল  এরপর শুরু হল করোনা ভাইরাস। লকডাউন, মাসের পর মাস। এই ভয়ঙ্কর বিপদে এক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী ভাঙ্গা মসজিদ এর পাশে রামমন্দিরের শিলান্যাস করলেন। সংবিধান একটা হাত মোছার রুমাল হয় গেল । পশ্চিম বাংলায় ২০২১ এর ভোটে যে ঐতিহাসিক সর্বনাশ ঘটতে চলেছে তা না বুঝতে পারলে বাঙালি সত্তা ,ভাষা , ইতিহাস,সংস্কৃতি ও জীবন দর্শন এখানেই শেষ ।টিএমসি,কংগ্রেস,বাম কেউ বাঁচাতে পারবেও না, আসবেও না। লালন,রবীন্দ্রনাথ,নজরুল ধীরে ধীরে লুপ্ত হবেন।হিংস্র,ধর্মান্ধ  নব্য ফ্যাসিবাদ শুধু রাজত্ব করবে তাই নয় স্ট্রিম রোলার চালাবে। মুক্ত চিন্তা ও মত প্রকাশ নিষিদ্ধ হবে। ব্যাঙ্ক ডাকাতি হবে।বাঙ্গালি সত্তার অবশিষ্ট হাসিটুকুও মিলিয়ে যাবে।                                                        তবু বাংলার মুখ একটা ভাষা- সংস্কৃতি মঞ্চ,রাজনীতির মঞ্চ নয়। তাই তার প্রকাশ অবশ্যই শ্লোগান ধর্মী  হবে না । বিশ্লেষণ ,প্রতিবেদন, তথ্য সন্ধান, কবিতা , গল্প, কৌতুক  ছোট ছোট সময় ভাবনা, নাটকের পরিসর। প্রতিবাদ এবং অধিকার রক্ষার জন আন্দোলন তার ভাষা বন্ধন ।এ ছাড়া আমাদের পরিকল্পনা আছে আবহমান  বাংলার সহজিয়া বৌদ্ধ ,বৈষ্ণব ও লৌকিক ইসলামের ধারা গুলি অনুধাবন করা, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন,অদ্বৈত মল্লবর্মন , উভয় বাংলার এবং ঈশান বাংলার ইতিহাস ও বর্তমান। শ্রেণী ও বর্ণের আন্ত সম্পর্ক , সমস্ত জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, গণতন্ত্র ও প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রের অনুসন্ধান, প্রান্তিক ও অসংগঠিতদের জীবন ও সংগ্রাম প্রান্তের মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং আন্তর্জাতিক কর্পোরেট পুঁজির লুণ্ঠন এবং মানুষের জল,জমি ও জঙ্গলের প্রতি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার  ও  বর্ণবাদ বিরোধী নারীমুক্তি আন্দো্লন । পয়লা বৈশাখ ও ভাষা দিবসের মত সব সম্প্রদায়ের উতসব পালন করা । লিঙ্গ-সাম্যের প্রতিষ্ঠা। এক কথায় মানবতার জয়গান করা।